04:37:51 am
Sunday, June 21

তুরস্ক-সিরিয়ায় ভূমিকম্প: ক্ষীণ হয়ে আসছে জীবিত উদ্ধারের আশা

এ যাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পে তুরস্ক ও সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে নিহতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে সরকারিভাবে তুরস্কে ১৬ হাজার ৫৪৬ এবং সিরিয়াতে ৩১৬২ জনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ যাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পে তুরস্ক ও সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে নিহতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে সরকারিভাবে তুরস্কে ১৬ হাজার ৫৪৬ এবং সিরিয়াতে ৩১৬২ জনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও আটকে আছেন অনেকে। স্মরণকালের এ ভূমিকম্পে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে লাখো মানুষের জীবন। সময় যত গড়াচ্ছে ততই বাড়ছে অনিশ্চয়তা। সর্বস্ব হারিয়ে দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন অনেকে। প্রচণ্ড ঠান্ডা ও তুষারপাতের মতো চরম প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিলম্বিত হচ্ছে উদ্ধারকাজও। ফলে সময় যত গড়াচ্ছে, ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিতদের উদ্ধারের আশা ততই 
ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবে বৃহস্পতিবার ভূমিকম্প পরিস্থিতি চতুর্থ দিনে গড়ালেও এখনও ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হচ্ছে। 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডব্লিউএইচও অনুমান করছে, তুরস্ক এবং সিরিয়াজুড়ে আড়াই কোটিরও বেশি মানুষ এই ভূমিকম্পের শিকার হয়েছেন। সোমবার ভোররাতে গাজিয়ানটেপের কাছে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। স্থানীয় সময় প্রায় দুপুর দেড়টার দিকে আরও একটি ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। কর্মকর্তারা বলেছেন এটি ‘আফটারশক’ ছিল না। সোমবার দুটি ভূমিকম্পের পর তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে পরপর কয়েকটি শক্তিশালী আফটারশক ও কম্পন আঘাত হেনেছে।
ভূমিকম্পে প্রায় ৬ হাজার ভবন ধসে পড়েছে বলে জানান তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তুরস্কের দুর্যোগ ও জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আফাড তার সর্বশেষ আপডেটে জানিয়েছে, ২৪ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি জরুরি কর্মীকে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে মোতায়েন করা হয়েছে। তবে এই শীত মৌসুমে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেলে উদ্ধার অভিযান বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ভূমিকম্পে বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি ধসে পড়েছে বহু মহাসড়ক। ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। যার কারণে তুরস্কের হাতায় ও সিরিয়ার আলেপ্পো শহরের দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে পারছেন না উদ্ধারকর্মীরা।
তুর্কি সাংবাদিক ইব্রাহিম হাসকোলোলু বলেছেন, মানুষ এখনও ধসে পড়া ভবনের নিচে রয়েছে, তাদের সাহায্যের প্রয়োজন। ধ্বংসস্তূপের নিচে থেকে আটকে পড়া লোকজন তাকে এবং অন্যান্য সাংবাদিকদের ভিডিও, ভয়েস নোট এবং তাদের লাইভ অবস্থান পাঠাচ্ছে। তারা আমাদের বলছে যে তারা কোথায় আছে এবং আমরা তাদের জন্য কিছুই করতে পারছি না। 
তুরস্ক-সিরিয়ার পাশে বিশ্ব : ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের পর তুরস্ক-সিরিয়ার প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক দেশ। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাচ্ছে ত্রাণ, উদ্ধারকারী দল ও চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।
তুরস্ককে সহায়তার জন্য ১৯টি দেশের ২৭টি অনুসন্ধান, উদ্ধার ও মেডিকেল টিম গঠন করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ১ হাজার ১৫০ জনেরও বেশি উদ্ধারকর্মী ও ৭০টি বিশেষ কুকুর পাঠানো হয়েছে। 
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মুখপাত্র জন কিরবি বলেছেন, ৭৯ জন করে দুটি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পাঠাচ্ছে তারা। চীন জানিয়েছে, দেশটির প্রথম উদ্ধারকারী দল মঙ্গলবার তুরস্কে কাজ শুরু করেছে। উদ্ধার ও চিকিৎসক দলসহ ৫৯ লাখ ডলার অর্থ সহায়তা পাঠিয়েছে বেইজিং।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বলেছেন, ৭৭ জনের অনুসন্ধান ও উদ্ধার বিশেষজ্ঞ টিম, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও উদ্ধারকারী কুকুরসহ জরুরি মেডিকেল টিম গাজিয়ান্তেপে পৌঁছেছে। এ ছাড়া রাশিয়া, ভারত, জাপান, ইরাক, ইরান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, গ্রিস, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশের সরকার থেকে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে আন্তর্জাতিক সাহায্য পাঠানো হচ্ছে।
যেভাবে উদ্ধার করা হচ্ছে: গত কয়েক দিন দিনরাত উদ্ধারকাজে নিয়োজিত রয়েছেন হাজার হাজার উদ্ধারকর্মী। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবকরা।উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছেই আগে ঠিক করেন যে সেখানে কেউ জীবিত থাকতে পারেন কি না। তারা শব্দ দিয়ে ফাঁকা জায়গা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। এরপর গ্যাস লিক, পানির ঢল কিংবা আরও বিপজ্জনক কিছুর শঙ্কা আছে কি না সেটা যাচাই করা হয়। বড় মেশিনারি ব্যবহার না করে ছোট জিনিসপত্র দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা। উদ্ধারের আগে সবাইকে চুপ থাকতে বলা হয় যেন কেউ বেঁচে আছে কি না সেই শব্দ শোনা যায় ভালোমতো। এরপর থার্মাল ইমেজিং যন্ত্র, কার্বন-ডাই অক্সাইড ও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ব্যবহার করা হয়। 
উদ্ধারকৃতদের বিশেষ সেবার আহ্বান: সেভ দ্য চিলড্রেনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভূমিকম্পের তিন দিন পার হয়ে যাওয়ায় আটকে পড়াদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছে। আর পানি ও খাবার পৌঁছানোও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত এই ভূমিকম্পে ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 
সংস্থাটির কর্মকর্তা বেনা করগলু জানান, এই মুহূর্তে উদ্ধারকৃতদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশুদের, যারা চোখের সামনে নিজেদের বাড়ি ধসে পড়তে দেখেছে। 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তা রবার্ট হোলডেন বলেন, হাজার হাজার মানুষের এখন সহায়তা প্রয়োজন। তাদের অনেকের কাছে বিশুদ্ধ খাবার পানিও নেই।
উদ্ধারকাজে অনিয়মের অভিযোগ: উদ্ধারকাজে অনিয়ম ও বেশকিছু সমস্যার কথা স্বীকার করে নিয়ে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান বলেন, এত বড় দুর্যোগে কোনো ধরনের পূর্ব প্রস্তুতিই যথেষ্ট নয়। দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাসও দেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকর্মীদের দেরিতে পৌঁছানো নিয়ে আমি হতাশ। তবে দেরিতে হলেও উদ্ধারকর্মীরা এই মুহূর্তে স্বাভাবিকভাবে কাজ করছেন। বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে ধ্বংসস্তূপ সরাতে ও আটকে পড়াদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, কেউ গৃহহীন থাকবে না।
পৌঁছেছে জাতিসংঘের ত্রাণ: সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য ত্রাণ পাঠিয়েছে জাতিসংঘ। ভূমিকম্পের তিন দিন পার হওয়ার পর এই প্রথম বিদেশি ত্রাণ পাচ্ছে গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত দেশটি। বৃহস্পতিবার তুরস্ক ও সিরিয়ার সীমান্তবর্তী বাব আল হাওয়া ক্রসিং দিয়ে সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে জাতিসংঘের ত্রাণবাহী ৬টি ট্রাক প্রবেশ করেছে।