ছিনতাইয়ে জড়াচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা
গত ৪ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার এলাকায় মারধর ও ছিনতাইয়ের শিকার হন এক দম্পতি। মারধর করে তাদের ২২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেন অপরাধীরা। এ ঘটনায় জড়িতরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় মামলা করেছেন ভুক্তভোগী।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, গত জানুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শহিদ মিনার, পলাশী মোড়, দোয়েল চত্বর ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ আশপাশের এলাকায় অন্তত এক ডজন ছিনতাই ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িতরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এসব ঘটনায় অভিযোগের পাশাপাশি শাহবাগ থানায় তিনটি মামলা করা হয়েছে। মামলাগুলোর এজাহার বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিটি মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত। ছিনতাইসহ এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের টনক নড়লেও ছাত্রলীগ সাংগঠনিকভাবে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এতে সংগঠনটির এসব বিপথগামী কর্মীর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও ইন্ধন রয়েছে ঘটনাগুলোর নেপথ্যে। পাশাপাশি এর পেছনে মাদকেরও বড় একটি প্রভাব আছে বলে মনে করেন তারা।
গত এক মাসে তিন মামলা, অভিযোগ এক ডজন : গত ১৫ জানুয়ারি রাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক দম্পতিকে মারধর ও হেনস্থা করে স্বর্ণালংকার ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রাহুল রায় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের তানজির আরাফাত ওরফে তুষারের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী মামলা করার দুদিন পর গ্রেফতার হন তানজির আরাফাত তুষার। তবে এক দিনের ব্যবধানে ছাড়া পেয়ে যান তিনি। রাহুল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদ্যসাবেক সদস্য।
আর তানজির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীম উদ্দীন হল শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তাদের দুজনকেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। এরপর গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাত ৩টার দিকে কাভার্ড ভ্যান আটকে ১৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর পথে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী। তারা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের ফজলে নাবিদ সাকিল, ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মো. রাহাত রহমান এবং সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাদিক আহাম্মদ। গ্রেফতার ওই তিন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী চালক দস্যুতার মামলা করলে পুলিশ তাদের কোর্টে পাঠায়।
জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি ছাত্রলীগ : ১৫ জানুয়ারির ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি তানজির আরাফাত তুষার বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকতের সঙ্গে রাজনীতিতে সক্রিয়। অন্য আসামি রাহুল রায় বর্তমানে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে রাজনীতি করছেন। শহিদ মিনারে ছিনতাই ও হেনস্থার ঘটনায় দায়ের করা মামলার দুই আসামি ফাহিম তাজওয়ার ও সাজিদ আহমেদ মাস্টারদা সূর্যসেন হল শাখা ছাত্রলীগের সদস্য। পলাশী এলাকায় কাভার্ড ভ্যান আটকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামিদের মধ্যে ফজলে নাবিদ সাকিল ও মো. রাহাত রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর শাখা ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী।
এসব ঘটনায় ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততা স্পষ্ট হলেও কোনো ধরনের ব্যবস্থাই নিতে দেখা যায়নি শীর্ষ নেতাদের। ‘অপরাধীদের স্থান ছাত্রলীগে নেই কিংবা এসব ঘটনায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা মুখে বললেও বাস্তবে এড়িয়ে যান। জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনকিভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। আর এতে অপরাধীরা আরও সহস পেয়ে যান।
এ সব বিষয়ে জানতে ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়নের সঙ্গে কথা বলে সময়ের আলো। তিনি বলেন, এ ধরনের সন্ত্রাসী কাজের যারা যুক্ত, ছাত্রলীগে তাদের স্থান হবে না। ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাদের যুক্ত করা হবে না। আমরা ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা তাদের বলেছি, যেন আইনানুগ প্রক্রিয়ায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে আমরা সহযোগিতা করব। এসব অনিয়মরে বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করি।
ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত বলেন, যারা ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে এ ধরনের কাজ করে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও আমরা এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছি।
হার্ডলাইনে প্রশাসন
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাসে ছিনতাইয়ের ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গত ১৫ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত তানজির আরাফাত তুষারকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করে কর্তৃপক্ষ। তাদের কেন স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না এ মর্মে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। ছিনতাইসহ সব অপকর্মের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রক্টর। সমসাময়িক অন্যান্য ঘটনাগুলোয়ও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেন, বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা দুঃখজনক। কেবল মেধাবী হলেই হবে না, পাশাপাশি সততার বিষয়টি লালন করাও জরুরি। এ জায়গায় আমরা একটা ঘাটতি দেখছি। তারা কি আগে থেকেই এ ধরনের কাজে জড়িত নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসার পর অন্যদের সংস্পর্শে এসে অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে সেটিও ভাবার বিষয়। সবকিছু মাথায় নিয়ে আমরা সামনে এগোচ্ছি। আমরা সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তথ্য-প্রমাণ থাকলে অবশ্যই যেন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। তাদের আমরা সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছি, কাউকে যেন ছাড় না দেওয়া হয়। ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপকর্ম রোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আমরা টহল ও নজরদারি বৃদ্ধি করেছি। আর এসব অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত কেউ শনাক্ত হলে দ্রুতই তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আগের তুলনায় ছিনতাই বেড়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূর মোহাম্মদ বলেন, ছিনতাই বেড়েছে বিষয়টি এমন নয়। আমরা সবসময়ের মতোই তৎপর আছি। এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগী মামলা করতে এলেই আমরা তা গ্রহণ করি এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নিই। জড়িতদের ছাড়িয়ে নিতে রাজনৈতিকভাবে সুপারিশ আসার বিষয়টি নাকচ করে দেন পুলিশের এ কর্মকর্তা।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের সমাজের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত অন্যায়, অনিয়ম, অবিচার হচ্ছে। সমাজে আইনের শাসন নেই। আইনের প্রয়োগ সঠিকভাবে হচ্ছে না। অপরাধীরা অপরাধ করে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। এসব দেখেই কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থীরা বড় হচ্ছে। ফলে তাদের আচরণে স্বাভাবিকভাভেই এর প্রভাব পড়ছে। তারা নিজেরাও জড়িয়ে পড়ছেন ছিনতাইয়ের মতো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে।
এসব প্রতিরোধে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শক্তিশালী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন এ মনোবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, আমি সমাজের কোনো প্রতিষ্ঠানকে আলাদা করে ব্যবস্থা নেওয়ায় সমাধান দেখছি না। আমাদের পুরো সমাজব্যবস্থাকেই পরিবর্তন করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ‘দুষ্টের পালন ও শিষ্টের দমন’-এর পরিবর্তে ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন’ নীতি অনুসরণ করতে হবে।
পাশাপাশি জোরালো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সমাজের প্রত্যেকটি স্তরের মানুষকে এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হবে। তাহলে আমাদের শিক্ষার্থীরাও আর এসবে জড়ানোর সাহস বা সুযোগ কোনোটিই পাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও অপরাধবিজ্ঞানী ড. জিয়া রহমানে মতে, শিক্ষার্থীদের অপরাধকর্মে জড়ানোর পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও মাদকাসক্তির প্রভাব রয়েছে। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা পলিটিক্যাল মোটিভেশন ও পেট্রনাইজেশন থেকে এই ধরনের অপরাধে জড়িত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাদের মধ্যে এক ধরনের হিরোইজম কাজ করে। এ ছাড়া এক ধরনের লেভেলিংও এ ক্ষেত্রে কাজ করে। তারা অপরাধ করে, সাজা পায়, আবার জামিনে বেরিয়ে এসে একই কাজের পুনরাবৃত্তি করে।
ঢাবির এ অধ্যাপক বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, মাদক কেনার টাকায় টান পড়লে ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা। এ ধরনের ঘটনা সমাজের অন্য অনেক স্তরেও দেখা যায়। এসব অপরাধ বন্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি ইতিবাচক কাজে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে বলে মত দেন এ অপরাধ বিজ্ঞানী। তিনি বলেন, সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গঠনমূলক কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের সংযুক্ত করতে হবে। ইতিবাচক কাজকর্মে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসতে হবে। ভালো কাজের পুরস্কার থাকতে হবে। আমরা তো সেগুলো করতে পারছি না।

Join the conversation