10:46:16 am
Monday, August 24

সংঘাতের পথে রাজনীতি

জাতীয় নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ততই সংঘাতের দিকে গড়াচ্ছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। বিশেষ করে একই দিনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন সেই সংঘাতের আগুনে ঘি ঢালছে। যা ছড়িয়ে পড়ছে তৃণমূল পর্যায়ে। শনিবার ইউনিয়ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগের ‘শান্তি সমাবেশ’ ও বিএনপির ‘পদযাত্রা’ কর্মসূচি পালনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, মঞ্চ দখল ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। এমনটা বারবার ঘটলে তা রাজনৈতিক সংঘাতের ইঙ্গিত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, নির্বাচনের বছরে দেশের রাজনীতি উত্তাপ ছড়ায়, সংঘর্ষ হয়। অতীতেও তাই দেখা গেছে। তারা আরও বলেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সারা দেশের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করে তাদের সাংগঠনিক শক্তি পুনরুদ্ধার করতে চাচ্ছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও মাঠে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিতে একই দিনে কর্মসূচি পালন করছে। এটা কেন করছেন তা রাজনীতিবিদরাই ভালো বলতে পারবেন। এর ফলে তৃণমূল পর্যায়ে রজনৈতিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটা খুবই উদ্বেগজনক। এমনটা বারবার হতে থাকলে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হবে। একই দিন একই স্থানে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন গণতান্ত্রিক রাজনীতি নয়। এটা সংঘাত উসকে দেবে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা, যা দেশের রাজনীতিতে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়।

শনিবার দেশের ইউনিয়ন পর্যায়ে বিএনপি পদযাত্রা কর্মসূচি ও আওয়ামী লীগ শান্তি সমাবেশ কর্মসূচি পালন করে। এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সিরাজগঞ্জে বিএনপির বিরুদ্ধে দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও ১৩টি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, ভাঙচুর, মঞ্চ দখল, গ্রেফতার ও কর্মসূচি পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করেছে বিএনপি।

বিএনপির দাবি, শনিবার সরকার পতনের পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলায় তাদের পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছে। শতাধিক বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং লুটপাট চালানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ২ শতাধিক বিএনপির নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। দলটি বলছে, তাদের কর্মসূচি ‘শান্তিপূর্ণ’ ও ‘পূর্বঘোষিত’। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাদের কর্মসূচি ঘোষণার পর একই দিনে একই স্থানে কর্মসূচি দিয়ে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করছে।

পাল্টা কর্মসূচি প্রত্যাহার করতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রতিটি কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ পাল্টা কর্মসূচি দিচ্ছে। একটা কথা খুব জোর দিয়ে বলতে চাই যে, আওয়ামী লীগ প্রথম থেকেই চেষ্টা করছে উসকানি দিয়ে, হুমকি দিয়ে বিভিন্নভাবে আমাদের শান্তিপূর্ণ কমসূচিকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য। এই পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে তারা কিন্তু গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তারা বাংলাদেশের স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিএনপির পদযাত্রায় আওয়ামী সন্ত্রাসী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হামলা ও গুলিবর্ষণ চালিয়েছে, গ্রেফতার করেছে। বিএনপি জনগণের দাবি নিয়ে যখনই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে একই স্থানে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে সন্ত্রাসকে উসকে দিয়ে দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চায়।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলছে, তারা পাল্টা কর্মসূচি দিচ্ছে না। সরকারি দল হিসেবে দায়িত্ব হচ্ছে দেশে যাতে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। বিএনপি আন্দোলনের নামে যেন সন্ত্রাস না করতে পারে সে জন্য তাদের নেতাকর্মীরা রাজপথে আছে, থাকবে। তাদের প্রতিদিনই কর্মসূচি থাকে, এটা আগামী নির্বাচন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আমরা পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি করছি না। আমরা সন্ত্রাসের আশঙ্কায় শান্তি সমাবেশ করছি। যতক্ষণ বিএনপি আন্দোলন করবে আমরা শান্তি সমাবেশ করব। আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমাদের এই স্বাভাবিক কর্মসূচি আগামী নির্বাচন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশের রাজনীতি সংঘাতের দিকেই গড়াচ্ছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি তাদের কর্মসূচি দিচ্ছে। আবার একই দিনে একই স্থানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও কর্মসূচির ঘোষণা দিচ্ছে। ফলে সংঘাত অনিবার্য তাই হচ্ছে। এটা গণতান্ত্রিক রাজনীতি নয়। তিনি বলেন, মনে হচ্ছে, ক্ষমতাসীনরা কোনো সমঝোতায় না গিয়ে সংঘাতের পথে হাঁটছে। এটা খুবই দুঃখজনক।

তিনি বলেন, নিউজিল্যান্ডে বিরাট মুসলিম কমিউনিটি আছে, সেখানে তো কোনো সংঘাত হয় না। এখানে আমরা সবাই বাঙালি, ৯০ শতাংশ মুসলমান, একই কৃষ্টি-কালচার, তারপরও কেন সংঘাত হয়? কারণ হচ্ছে ক্ষমতা। আমাদের দেশের রাজনীতিকরা জনগণের কথা চিন্তা করে না। দেশের রাজনীতিতে সমঝোতা দরকার, তাহলেই সংঘাত দূর হবে বলে মনে করেন তিনি। 

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, এখন পর্যন্ত দেশের রাজনীতি চিন্তার পর্যায়ে যায়নি। যা ঘটছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটা অস্বাভাবিক নয়। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, আগামীতে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে কি না তা এখনই বলা যাচ্ছে না। দেশের অতীত ইতিহাস বলে নির্বাচনের বছরে ‘ভায়োলেন্স’ বেড়ে যায়। এবারও ব্যতিক্রম নয়।

তিনি বলেন, রাজনীতিবিদরা রাজনীতি থেকেই শেখেন। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি চলতে থাকবে। এটা আগে যে হয়নি তেমন না। দেখা দরকার যে ভায়োলেন্স ওই পর্যায়ে যায় কি না, লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে কি না। আগামীতে রাজনীতি সংঘাতময় পরিস্থিতি হবে কি না সেটা এখনই বলা যায় না।

Share this post

Join the conversation