06:05:24 am
Saturday, August 22

সংঘাতের পথে রাজনীতি : মুখে অহিংস, মাঠে সহিংস

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই মুখে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের কথা বললেও মাঠে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘিরে দুই দলের নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি সংঘাত হচ্ছে। এ নিয়ে একে অন্যকে দোষারোপ করছে দল দুটি।

আওয়ামী লীগের দাবি, তারা কোনো সংঘর্ষে জড়াচ্ছে না। সবখানে পাহারা দিচ্ছে। বরং বিএনপি পুরোনো চেহারায় ফিরেছে। তারা অরাজকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বিশৃঙ্খলা করলে শক্তহাতে দমন করা হবে। উল্টো কথা বলছে বিএনপি। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ গায়ে পড়ে ঝগড়া করছে। সবখানে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দিয়ে সংঘাতের পথকে উসকে দিচ্ছে। ক্ষমতাসীনরা এমন ধারা চালু রাখলে বিএনপি প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।  

শনিবার ইউনিয়ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘিরে সংঘাতের যে আশঙ্কা ছিল, বাস্তবেও সেটি দেখা গেছে। অন্তত ১৫টি জেলায় পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘিরে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ওই দিন বিএনপি পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেছে। আওয়ামী লীগ করেছে শান্তি সমাবেশ। এর মধ্যে নাটোরে বিএনপির পদযাত্রা মঞ্চ দখল করে আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ করার মতো ঘটনাও দেখা গেছে। 

এ ছাড়া সিরাজগঞ্জে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল ও দোকানে ভাঙচুর করা হয়। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির সংঘর্ষের সময় পুলিশ শটগান ও রাইফেল থেকে গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন জেলায় সংঘাতের ঘটনায় বিএনপির ওপর দায় চাপিয়েছে আওয়ামী লীগ।

দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, গণতন্ত্রের নামে বিএনপিকে আর ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালের মতো অগ্নিসন্ত্রাস সৃষ্টি করে নিরীহ মানুষ হত্যার অপরাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হবে না।

আর বিএনপির অভিযোগ, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রশাসন পরিকল্পিতভাবে তাদের কর্মসূচিতে বাধা দিয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় হামলা করে নেতাকর্মীদের আহত করেছে। সংঘর্ষ এড়াতে বিভিন্ন জায়গায় কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত বা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন তারা।

এ ঘটনায় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স সোমবার সময়ের আলোকে বলেন, আমরা পূর্বঘোষণা দিয়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি করছি। আর আওয়ামী লীগ একই দিনে কর্মসূচি দিচ্ছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে। আমরা কর্মসূচি দেওয়ার পরেরদিন তারা ঘোষণা দিচ্ছে। সরকারি দল আগে কর্মসূচি দিলে আমরা একই দিন কর্মসূচি দেব না। আওয়ামী লীগের কর্মীরা বিনা উসকানিতে হামলা করেছেন আমাদের ওপর। এ সংঘাতের দায়ভার সরকারের। তাদের সহনশীল হতে হবে। তা না হলে বিএনপিও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করা হয়েছে, তারা বরং বিএনপির কর্মসূচিতে ‘নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন’। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমানের মতে, দ্বৈবক্রমে একই দিনে কর্মসূচি হতেই পারে। এটা পাল্টাপাল্টি নয়। আওয়ামী লীগ তা উদ্দেশ্যমূলক করছে না। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, আমি সংঘাত কিংবা সংকট কোনোটারই আশঙ্কা করছি না। বিএনপি তাদের কর্মসূচি পালন করছে; আওয়ামী লীগ নিজেদেরটা করছে। এতে কোনো সমস্যা দেখছি না। বরং মানুষ কর্মসূচি দেখে বিচার করবে কোনটি সঠিক, কোনটি বেঠিক।  

সংঘাতের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপি জনগণের দাবি নিয়ে যখনই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে একই স্থানে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে সন্ত্রাসকে উসকে দিচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চায়। আমরা একই দিনে কর্মসূচি পালন না করার আহ্বান জানাচ্ছি বারবার।

বিএনপি সর্বশেষ রোববার রাজধানী ঢাকায় গণপদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেছে। এ কর্মসূচি থেকে আবার নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তারা আগামী ১৮ ফেব্রæয়ারি সব মহানগরের পদযাত্রা করতে চায়।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় ইইউর উদ্বেগ : নির্বাচনের বছরখানেক আগে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও জোটটির সদস্য দেশগুলোর ঢাকা মিশন। গত কয়েকদিনে পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে রোববার ঢাকায় ইইউ ডেলিগেশনের পক্ষে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ইন বাংলাদেশ নামে টুইটার অ্যাকাউন্টে এক টুইটে এ কথা জানানো হয়।

ওই টুইট বার্তায় বলা হয়েছে, ইইউ এবং ইইউ সদস্য দেশগুলোর ঢাকা মিশন রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সবাইকে শান্তিপূর্ণ ও আইন মেনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছেন তারা।

সরকার হটানোর আন্দোলনে তৃণমূলের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে শনিবার দেশজুড়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘পদযাত্রা’ করে বিএনপি। যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে এদিন গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, এলডিপি, গণফোরাম, পিপলস পার্টি, বাম গণতান্ত্রিক ঐক্য রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে একই কর্মসূচি পালন করে।

বিএনপির এ কর্মসূচির দিনে তৃণমূলের নেতাকর্মীদেরকে সক্রিয় করতে ‘শান্তি সমাবেশ’র কর্মসূচি ডাকে আওয়ামী লীগ। তবে ক্ষমতাসীন দলটি একে ‘পাল্টা কর্মসূচি’ বলতে নারাজ।

দুই পক্ষের কর্মসূচিতে কেন্দ্র করে শনিবার সকাল থেকেই বিভিন্ন জেলা থেকে সহিংসতার খবর আসতে থাকে। কোথাও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, কোথাও পুলিশের বাধার মুখে পড়েন বিএনপির নেতাকর্মীরা। বিএনপির মঞ্চে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সমাবেশ করার ঘটনাও ঘটে একটি জেলায়।

 

 

Share this post

Join the conversation