বসন্তের উচ্ছ্বাস বইমেলায়
শীতের বিদায়, প্রকৃতিতে ঋতুরাজ বসন্তের আগমন। বাংলা পঞ্জিকা বলছে, আজ প্রভাত থেকেই শুরু হয়েছে বসন্ত। সোমবার ছিল শীতের শেষ দিন। তবে বইমেলায় বসন্তের আমেজ শুরু হয়ে গেছে শীতের শেষ প্রহর থেকেই। পরনে বাসন্তী রঙের শাড়ি, আর মাথায় গাঁদা ফুলের মালা। এক হাতে বই, অন্য হাতে ধরা হলুদ পাঞ্জাবি পরা প্রিয় মানুষের হাত। গতকাল শীতের শেষ বিকালে এমন সাজেই সেজেছিল অমর একুশে বইমেলা।
সোমবারও পাঠকদের জন্য বইমেলার প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় বেলা ৩টায়। তবে তার আগেই বইমেলায় চলে আসেন পাঠকরা। সকাল থেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মেলার বাইরের অংশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, কার্জন হল, চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণ ও শহিদ মিনার এলাকায় বাসন্তী সাজে ভিড় করেন তারা। বেলা ৩টার আগেই বইমেলায় প্রবেশ করতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পড়েন বইপ্রেমীরা।
মেলায় আসা বিভিন্ন বয়সের পাঠকদের পোশাক ও সাজসজ্জায় ছিল বসন্তের আবহ। বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে এসেছিল একদল তরুণী। জিজ্ঞেস করতেই জানা গেল তারা সবাই রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রী।
তাদের একজন ইসরাত ইরা খানিকটা রসিকতা করে বলেন, পঞ্জিকার হিসাবে বসন্ত এক দিন পরে হলেও প্রকৃতি তা বলছে না। প্রকৃতির মতো আমাদের মনের বসন্ত ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। ইরার বান্ধবী মিথিলার বক্তব্য অবশ্য কিছুটা ভিন্ন। তার মতে, বসন্তের প্রথম দিন বইমেলায় অনেক মানুষের সমাগম হয়। এত মানুষের মধ্যে চলাফেরা করতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। তাই এক দিন আগেই বসন্ত উদযাপনে এসেছেন তিনি।
একই বক্তব্য রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে আসা তরুণী স্নেহা ঘোষের। তিনি বলেন, প্রতিবারই বসন্তের প্রথম দিন মানুষের ভিড় থাকে। সেদিন ঘুরেও আনন্দ পাওয়া যায় না, ছবিও তোলা যায় না। আমি বসন্তের সাজে সাজব, ছবি তুলব না তা কী করে হয়! ছবি তুলতে আমি একজন ফটোগ্রাফার নিয়ে সকাল সকাল এদিকে এসেছি। ফটোশুট শেষ করে বইমেলায় যাব, হুমায়ূন আহমেদের দুটি বই কিনব। এর থেকে ভালোভাবে আর বসন্ত উদযাপন করা যায় না বলে আমার মনে হয়।
তবে বসন্তের আগমনে অনেকেই উচ্ছ্বসিত হলেও কিছুটা বিষণ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান। তার মতে, শীতের সন্ধ্যায় টিএসসিতে বসে গরম চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার তৃপ্তিই আলাদা। আর এর সঙ্গে যদি থাকে নতুন বইয়ের সংযোগ, তাহলে তো পুরোই জমে যায়। আজ শীতের শেষ সন্ধ্যা। তাই তারা বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিচ্ছেন, যাবেন বই মেলাতেও।
এদিন অন্যান্য দিনের তুলনায় বইমেলায় কিছুটা ভিড় বেশি থাকায় বই বিক্রিও হয়েছে বেশ। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দর্শনার্থীদের ভিড় ও বই বিক্রি আরও বাড়তে থাকে। বিকালের পর মেলার দুই পাশের প্রবেশদ্বারে দেখা গেছে দীর্ঘ লাইন। বাইরের দীর্ঘ লাইনের মতো ভেতরেও ভিড় ছিল। ভিড় সামলে নিয়ে স্টলের সামনে জায়গা করে পছন্দের বই কেনেন ক্রেতারা। এদিন বিক্রিও বেশি ছিল বলে জানান প্রকাশকরা। তবে আজ বসন্তের প্রথম দিনে বিকিকিনি সর্বোচ্চ হবে বলে প্রত্যাশা করছেন তারা।
শোভা প্রকাশের প্রকাশক মিজানুর রহমান বলেন, প্রতি বছরই বইমেলায় শুরুর দিকে পাঠকদের উপস্থিতি কম থাকে। এতে শুরুর দিকে বইয়ের বিক্রিও হয় কম। বইমেলা মূলত জমে উঠে ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে। আর সর্বোচ্চ বিকিকিনি হয় বসন্তের দিন, আগের দিন ও একুশে ফেব্রæয়ারিতে। গত কয়েক বছর তো ভালোবাসা দিবস ও বসন্ত একই দিনে হচ্ছে।
সোমবার অমর একুশে বইমেলার ১৩তম দিনে নতুন বই এসেছে ১০৫টি। আগামীকাল যথারীতি বইমেলা শুরু হবে বেলা ৩টায়, চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। সোমবার বিকাল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ : আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মফিদুল হক। আলোচনায় অংশ নেন হারিসুল হক এবং অপূর্ব শর্মা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আবেদ খান।
প্রাবন্ধিক বলেন, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী দীর্ঘজীবী কর্মবীর ব্যক্তিত্ব। তার প্রধান পরিচয় সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে। উভয় ক্ষেত্রে তার হাতে ছিল কলম যা অপূর্ব আলোর ঝলকানিতে জ্বলে উঠেছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর। আবেগ ও উপলব্ধির মিশেল ঘটিয়ে তিনি এমন এক কবিতা লিখেছিলেন যা ছুঁয়ে গিয়েছিল জাতির অন্তর। আলতাফ মাহমুদের সুরে একুশের প্রভাতফেরিতে গীত হয়ে জুগিয়েছিল জাগরণের বাণীমন্ত্র। সেই থেকে তার কলম নানা সন্ধিক্ষণে সমাজের চিন্তাস্রোতকে প্রভাবিত করেছে, মানুষকে আলোড়িত করেছে, বাঙালিকে করেছে জাতিচেতনায় সংহত।
আলোচকরা বলেন, বাঙালির ভাষা আন্দোলন নিয়ে বহু গান রচিত হলেও সাংবাদিক, কবি, কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি সব বাঙালির মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। পেশাগত জীবনে সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী প্রাণের আনন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন লেখালেখিতে। আজীবন তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করেছেন এবং অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন।
সভাপতির বক্তব্যে আবেদ খান বলেন, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর জীবন ও কর্ম অনেক বিস্তৃত। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের মহীরুহদের একজন। যে আদর্শ ও সৃজনশীলতা নিয়ে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সাংবাদিকতা করেছেন তা আমাদের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে।
আজ বিকাল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ এবং বিদেশি সাহিত্যের বাংলা অনুবাদ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন জিএইচ হাবীব এবং শামসুদ্দিন চৌধুরী। আলোচনায় অংশ নেবেন সম্পদ বড়ুয়া, রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক মো. আবু জাফর এবং মাহবুবা রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ফকরুল আলম।

Join the conversation