খোলা বাসে আনন্দ মেসিদের আগে সাবিনা-কৃষ্ণারা
২০২২ সালে ক্রীড়াপ্রেমীদের আবেগের সবটুকু জুড়েছিল খোলা বাস। তিন যুগের আক্ষেপ ঘুচিয়ে ফুটবলের প্রবাদ পুরুষ দিয়েগো ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দিয়েছেন ফুটবল নন্দন লিওনেল মেসি।
২০২২ সালে ক্রীড়াপ্রেমীদের আবেগের সবটুকু জুড়েছিল খোলা বাস। তিন যুগের আক্ষেপ ঘুচিয়ে ফুটবলের প্রবাদ পুরুষ দিয়েগো ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দিয়েছেন ফুটবল নন্দন লিওনেল মেসি। এই বিশ্বকাপ শিরোপা উৎসবের সমাপ্তি হয়েছে খোলা বাসে জন-উৎসবের মধ্য দিয়ে। বিশ্বকাপের সঙ্গে হয়তো ফুটবলের পিছিয়ে পড়া জনপদ দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের কোনো তুলনাই চলে না। তারপরও বছরের শেষ দিকে বুয়েন্স আয়ার্সে খোলা বাসে মেসিদের নিয়ে যে জনতার ঢেউ তেমনটাই দেখা গেছে সাবিনা-কৃষ্ণাদের বেলাতেও। বুয়েন্স আয়ার্স আর ঢাকার আবেগ মিলেমিশে হয়েছে একাকার।
মেসির হাতে বিশ্বকাপ ও ফুটবলের দায়শোধ : ২০২২ বছরটি বিশেষভাবে স্মরণীয় থাকবে ফুটবলের বরপুত্র লিওনেল মেসির জন্য। ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছেন এই আর্জেন্টাইন সেনসেশন। একেক করে বিশ্বকাপের পঞ্চম মিশনে এসে পরম কাক্সিক্ষত এই ট্রফির নাগাল পেলেন মেসি।
ফুটবলের অহংকার ম্যারাডোনার তিন যুগ পর বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেল আর্জেন্টিনা। ফুটবলপিয়াসীরা অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থেকেছে- এবার বুঝি আর নিরাশ হতে হবে না, ট্রফিতে চুমু খাবেন মেসি। অপেক্ষা হয়েছে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। অবশেষে নাটকীয়তায় ভরপুর কাতার বিশ্বকাপে হৃদয়-মন পূর্ণ হয়েছে ভক্তদের। মেসির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি, এমন একটি দৃশ্য দেখার জন্য হাজারো বিনিদ্র রজনি কাটানো ভক্তদের জন্য সবচেয়ে বড় উপহারটাই দিল কাতার বিশ্বকাপ।
বিশ্বকাপ ছাড়াই মেসি ক্যারিয়ার শেষ করবেন বোধকরি ফুটবলে- এর চেয়ে বড় আক্ষেপ আর হতে পারত না। ফুটবলকে মেসি যা দিয়েছেন তাতে বিশ্বকাপ শিরোপা তো তার প্রাপ্যই। সেই দায়ই যেন শোধ করল এবারের বিশ্বকাপ। মেসির বিশ্বকাপ জয় ছাড়াও এবারের কাতার বিশ্বকাপ ছিল ঘটনার ঘনঘটায় ভরপুর। ফিফার মেগা আসরটি হয়ে ওঠে ফুটবলে আরব পুনর্জাগরণের মঞ্চ।
আরব ও আফ্রিকা থেকে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে ওঠার কৃতিত্ব দেখায় মরক্কো। সেরা হয়ে গ্রুপ পর্ব পার করে ফুটবলের দুই প্রতিষ্ঠিত শক্তি স্পেন ও পর্তুগালকে হারিয়ে পৌঁছে যায় শেষ চারে। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তারা হেরে যায় ফ্রান্সের বিপক্ষে।
প্রযুক্তির ব্যবহার, নতুনত্ব আর অভিনবত্বে অতীতকে টেক্কা দিয়েছে কাতার বিশ^কাপ। শীতকালে এই প্রথম বিশ^কাপ আয়োজনকে ঘিরে সমালোচনাও হয়েছে যথেষ্ট। টাকার কাছে ফিফা বিক্রি হয়ে গেছে, উঠেছে এমন কথাও। তবে একটা দুর্দান্ত বিশ্বকাপ উপহার দিয়ে নিন্দুকদের মুখ বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে আয়োজকরা। প্রথমবারের মতো ছেলেদের বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনা করেছেন নারী রেফারিরা। এটাকে একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছে সবাই।
বাংলার মেয়েদের হাতে সাফ শিরোপা : ২০২২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ফুটবলে স্বর্ণাক্ষরে লেখা একটি দিন। এই দিন সাফ নারী ফুটবলে প্রথমবারের মতো শিরোপা জেতে বাংলাদেশ। আগের পাঁচ আসরে প্রতিবারই ট্রফি জয়ের কৃতিত্ব দেখায় ভারত। গ্রুপ পর্বে আগের আসরগুলোর নিয়মিত চ্যাম্পিয়ন ভারতকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শিরোপার পথে অনেকটাই এগিয়ে যায় বাংলার মেয়েরা। সেমিফাইনালে ভুটানকে ৮-০ গোলে ভাসিয়ে সাবিনা খাতুনরা উঠে আসে ফাইনালে। শিরোপার লড়াইয়ে স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে মেয়েরা। সাফ নারী ফুটবলে ভারতের বাইরেও চ্যাম্পিয়ন হওয়া যায়, এটা প্রমাণ করে ছাড়েন সাবিনা-কৃষ্ণারা।
এই ফাইনালকে সামনে রেখে বাংলাদেশ দলের অন্যতম ফুটবলার সানজিদা আখতারের একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস আবেগে ভাসায় পুরো দেশবাসীকে। তিনি লেখেন, ‘ছাদখোলা চ্যাম্পিয়ন বাসে ট্রফি নিয়ে না দাঁড়ালেও চলবে, সমাজের টিপ্পনীকে একপাশে রেখে যে মানুষগুলো আমাদের সবুজ ঘাস ছোঁয়াতে সাহায্য করেছে, তাদের জন্য এটি জিততে চাই। আমাদের এই সাফল্য হয়তো আরও নতুন কিছু সাবিনা-কৃষ্ণা-মারিয়া পেতে সাহায্য করবে।’
দক্ষিণ এশিয়ার বিশ^কাপখ্যাত এই টুর্নামেন্ট জেতার পর সানজিদাদের চাওয়াকে পূর্ণ করাটা পরিণত হয় এক দাবিতে। এগিয়ে আসে সংশ্লিষ্টরা। এরপর ছাদখোলা বাসের আনন্দমেলা। রাস্তার দুই পাশে জনতরঙ্গ। জন-উচ্ছ্বাসের ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলল সাবিনা-সানজিদা-মারিয়াদের বহন করা খোলা বাস। যেমনটা ঘটল বুয়েন্স আয়ার্সেও। খোলা বাসে লাখো জনতার ভালোবাসায় সিক্ত হলেন বিশ্বকাপজয়ী মেসিরা।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইংল্যান্ডের : টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরোতেই পারছে না বাংলাদেশ। ২০২২ আসরেও সাদামাটা পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়েই শেষ হয় টাইগারদের মিশন। মূল পর্বে দুটি ম্যাচ জেতে সাকিব আল হাসানরা, র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকা নেদারল্যান্ডস ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ৬ দলের গ্রুপে টাইগাররা লাভ করে পঞ্চম স্থান। অক্টোবর-নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অনুষ্ঠিত এই আসরেই ইংল্যান্ড দেখিয়েছে সময়টা এখন তাদের। ক্রিকেটের সব ফরম্যাটেই প্রতিপক্ষের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে দলটি। টি-টোয়েন্টি বিশ^কাপের অষ্টম সংস্করণে সবাইকে টেক্কা দিয়েছে ইংলিশরা। সেমিফাইনাল ও ফাইনালে উপমহাদেশের দুই ক্রিকেট পরাশক্তি ভারত ও পাকিস্তানকে নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করেছে জশ বাটলারের দল।
সেমিতে ভারতকে ইংল্যান্ড হারায় ১০ উইকেটে। বাবর আজমের পাকিস্তান অবশ্য কিছুটা প্রতিরোধ গড়তে সমর্থ হয়। ঐতিহাসিক মেলবোর্ন ক্রিকেট মাঠে শিরোপার লড়াইয়ে আগে ব্যাট করতে নেমে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৩৭ রান করে পাকিস্তান। এক ওভার হাতে রেখে ওই রান টপকে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব দেখায় ইংল্যান্ড। শুধু কি তাই, বছরের শেষ দিকে টেস্ট সিরিজে স্বাগতিক পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করেছে তারা। বলাবাহুল্য পাকিস্তান তাদের ক্রিকেট ইতিহাসে দেশের মাটিতে এই প্রথম ৩-০ ব্যবধানে হারের লজ্জায় ডুবল।
মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টে বাংলাদেশের ইতিহাস : টেস্টে বাংলাদেশের পথচলা প্রায় দুই যুগ হতে চলল। কিন্তু লঙ্গার ভার্সন ক্রিকেটে নিজেদের সেভাবে মেলে ধরতে পারেনি টাইগাররা। তবে এ বছর টেস্ট ক্রিকেটে নতুন উচ্চতায় উঠেছে বাংলাদেশ। টেস্টের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েছে তাদেরই মাটিতে। বছরের শুরুতেই মাউন্ট মঙ্গানুইতে কিউইদের হারিয়ে ঝড় তুলেছিল টাইগাররা। ৮ উইকেটে জয় পাওয়া এই টেস্টে বাংলাদেশের দুই পেসার ইবাদত হোসেন আর তাসকিন আহমেদের আগুন ঝরানো বোলিং প্রশংসা কুড়ায় দুনিয়াব্যাপী। উইকেট শিকারের পর ইবাদতের স্যালুট বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মাত্র ৪৬ রান খরচায় ৬ উইকেট নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে কিউইদের ধসিয়ে দেন এই স্যালুটম্যান। ম্যাচসেরার পুরস্কারও পান তিনি।
টাইগারদের দক্ষিণ আফ্রিকা জয় : টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অনুজ্জ্বল থাকলেও ওয়ানডে ক্রিকেটে যথেষ্টই আলো ছড়িয়েছে টাইগাররা। উপমহাদেশের দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দক্ষিণ আফ্রিকা সফর। এ বছর মার্চে এমন কঠিন চ্যালেঞ্জে গোটা ক্রিকেট দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দেয় বাংলাদেশ। তিন ম্যাচ সিরিজে স্বাগতিক প্রোটিয়াদের বিপক্ষে টাইগারদের জয় ২-১ ব্যবধানে। প্রথম ম্যাচে জয় ৩৮ রানে। সাকিবের ৭৭ রানে ভর দিয়ে ৩১৪ রানের সৌধ গড়ে বাংলাদেশ। জবাবে প্রোটিয়াদের ইনিংস শেষ হয় ২৭৬ রানে। দ্বিতীয় ম্যাচ ৭ উইকেটে জিতে সিরিজে সমতায় ফেরে দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় ম্যাচে স্বাগতিকদের ৯ উইকেটে হারিয়ে সিরিজ জয়ের গৌরবে ভাসে টাইগাররা।
ঘরের মাঠে আরেকবার ভারত-বধ : ওয়ানডে ক্রিকেটে বছরের শেষটাও রাঙিয়েছে বাংলাদেশ। ঘরের মাটিতে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজে ভারতকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছে টাইগাররা। মিরপুরে প্রথম ম্যাচে ভারতের গড়া ১৮৬ রান টপকানোর চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ নবম উইকেট হারায় ১৩৬ রানে। এ অবস্থায় খাদের কিনারা থেকে দলকে জয়ের ঠিকানায় পৌঁছে দেন মেহেদী হাসান মিরাজ ও মোস্তাফিজুর রহমান। অবিচ্ছিন্ন দশম উইকেট জুটিতে ৫১ রান যোগ করে দলকে ১ উইকেটের জয় এনে দেন তারা। দ্বিতীয় ম্যাচে ভারতকে ৫ রানে হারিয়ে সিরিজ নিজেদের করে নেয় বাংলাদেশ। তৃতীয় ও শেষ ম্যাচে ভারত জিতে হারের ব্যবধান কমায়।
টেনিসের মহীরুহ রজার ফেদেরারের অবসর : থামলেন টেনিস কোর্টে মোৎসার্টের সুর তোলা ৪১ বছর বয়সি রজার ফেদেরার। ২৮ বছর ধরে দেড় হাজারেরও বেশি ম্যাচ খেলেছেন এই টেনিস কিংবদন্তি। সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে ছয়বার জিতেছেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, একবার ফ্রেঞ্চ ওপেন, আটবার উইম্বলডন এবং পাঁচবার জিতেছেন ইউএস ওপেন। ২০টি গ্র্যান্ড স্লাম তার ঝুলিতে। গ্র্যান্ড স্লাম জয়ের ক্ষেত্রে রাফায়েল নাদাল ও জকোভিচ তাকে টপকে গেলেও ফেদেরার হয়ে থাকবেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা। কোর্টে নাদালের সঙ্গে তার মহাদ্বৈরথ টেনিসে যোগ করে নতুন মাত্রা। ফেদেরার অবসরের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর নাদাল এক টুইট বার্তায় বলেন, ‘ফেদেরার আমার বন্ধু ও প্রতিপক্ষ। কিন্তু আমি চাইনি, এই দিনটা আসুক। এটা টেনিসের দুঃখের দিন।’
