06:07:35 am
Wednesday, June 24

হেমাশ্রমে সাঙ্গ হলো সাধুসঙ্গ

‘এসো হে অপারের কান্ডরি, আর কি বসবো এমন সাধ বাজারে’ এই অমর বাণী মরমি সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের। লালনের এই বাণীকে প্রতিপাদ্য করে আয়োজন করা হয় ২৪ ঘণ্টাব্যাপী সাধুসঙ্গের। ভোরের আলো ফোটার আগেই দিনকে বরণ করে নিতে শুরু হয় নানা আয়োজন। সকাল ৬টায় হেমাশ্রমে বাউল গুরুর আদেশে সেবা গ্রহণ করেন বাউল, সাধু, সন্ন্যাসী, ভক্ত ও অনুরাগীরা।

‘এসো হে অপারের কান্ডরি, আর কি বসবো এমন সাধ বাজারে’ এই অমর বাণী মরমি সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের। লালনের এই বাণীকে প্রতিপাদ্য করে আয়োজন করা হয় ২৪ ঘণ্টাব্যাপী সাধুসঙ্গের। ভোরের আলো ফোটার আগেই দিনকে বরণ করে নিতে শুরু হয় নানা আয়োজন। সকাল ৬টায় হেমাশ্রমে বাউল গুরুর আদেশে সেবা গ্রহণ করেন বাউল, সাধু, সন্ন্যাসী, ভক্ত ও অনুরাগীরা।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুরে শুক্রবার হেমাশ্রমের সংযোজিত অংশের উদ্বোধন কর্মসূচি ছিল এদিন। একই সঙ্গে ছিল ফরাসি নাগরিক দেবোরা জান্নাত কিউকারম্যানের জন্মদিবস। দুইয়ে মিলে পুরো আয়োজন একটা পূর্ণতা পায়। শুধু কুষ্টিয়া নয় সারা দেশ থেকেই বাউলপ্রেমিরা জড়ো হন হেমাশ্রমে। আত্মশুদ্ধি, জ্ঞানযোগ আর গুরুকর্মে শেষ হয় সাধুসঙ্গ। সাধুসঙ্গের আয়োজক ছিলেন দেবোরা জান্নাত। তার আমন্ত্রণেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে সাধু, লালনভক্ত ও অনুসারীরা যোগ দেন। আলোচনা শেষে রাতভর চলে শিল্পী ও বাউলদের গান।

সাধুসঙ্গ অনুষ্ঠানে ফকির লালন সাঁইজির গীতজ্ঞান সুধা পরিবেশন করেন বাউলশিল্পীরা। লালন প্রেমে ডুবে ফ্রান্স ছেড়ে বাংলাদেশে সাত বছর ধরে বসবাস করছেন ফরাসি নাগরিক দেবোরা। পৃথিবীর পঞ্চাশটিরও বেশি দেশ ঘুরে সবশেষ বাংলাদেশ এসে তার মনে হয়েছে এটাই ‘আপন নীড়’। তাই তো বাউলসম্রাট লালন শাহকে ভালোবেসে প্রাগপুরে গড়ে তুলেছেন আশ্রমের বর্ধিত অংশ। তাক লাগানো এ আয়োজন মুগ্ধতাও ছড়িয়েছে সবার হৃদয়ে।  

প্রবীণ সাধু দরবেশ ফকির নহির শাহের মতে দরবেশ লালন সাঁইজির পথ ও মত ছিল প্রকৃতিবাদী। প্রকৃতিবাদী হয়ে প্রকৃতি সাধনের মাধ্যমে নিজের আত্মসংস্কার করে একজন সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার যে মাধ্যম তা হলো সাধুসঙ্গ। আর সাধুসঙ্গের মাধ্যমে লালন সাঁইজির আত্মদর্শন লাভ সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। পরিবার, দেশ ও সমাজকে ছেড়ে এই দেশে থিতু হওয়াতে দেবোরার প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান তিনি। 

তিনি বলেন, এমন জীবন সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়বে। যুগ যুগ বেঁচে থাকবে মানবপ্রেমে। 

সাধুসঙ্গে যোগ দেন বাংলা একাডেমির উপ-পরিচালক ড. সাইমন জাকারিয়া। তিনি বলেন, লালন সাঁইজিকে জানতে হলে নিজেকে ত্যাগ করতে হবে। আর যিনি ত্যাগ করতে পারেন তিনিই হলেন সাধক। ফরাসি থেকে এসে দেবোরা জান্নাত নিজেকে ত্যাগ করে লালনের দীক্ষা নিয়েছেন। তার জন্মদিনে সাধুসঙ্গের আয়োজন করেছেন, এটা বাংলাদেশি হিসেবে নিশ্চয় আমার কাছে গৌরবের। 

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আসেন দেবোরা। মাঝেমধ্যে ফ্রান্সে যান। কয়েক দিন থেকে আবার চলে আসেন। নাম বদল করে হয়েছেন দেবোরা জান্নাত। ফরাসি টোনে স্পষ্ট বাংলা বলতে পারেন এই তরুণী। এ ভাষাতে লিখতে পড়তেও বেশ পটু।  

বাউলদের জীবনাচারে প্রশান্তির কথা জানিয়ে সাধুসঙ্গের আয়োজক দেবোরা জান্নাত বলেন, সাঁইজির কৃপায় সাধুসঙ্গের আয়োজন করতে পেরে নিজেকে যেমন ধন্য মনে করছি, তেমনই তার গুরু যেমনভাবে সাধুসঙ্গের আয়োজন করেন বা তার গুরুর গুরুরা যেমনভাবে করেছেন। ঠিক সেভাবে সাধুসঙ্গের আয়োজন করেছি, গুরুর কৃপায় এ আয়োজনে কোনো সমস্যা হয়নি।

তার ভাষ্যে, এ সত্যসাগরে সবার পক্ষে সাঁতার কাটা সম্ভব নয় বলে প্রয়োজন হয় সাধুসঙ্গের। আবার সাধুদের মতে আত্মশুদ্ধি, আত্মত্ব রক্ষা ও সাদা মনের মানুষ হতে হলে গুরুভক্তির মাধ্যমে সেটা সম্ভব। আর এ জন্য প্রয়োজন সাধুসঙ্গের। তাই সত্যিকারের সাদা মনের মানুষ সাধুদের কাছ থেকে দেখে, সহজ মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে প্রয়োজন সাধুসঙ্গের। 

সাধুসঙ্গে আসা বেলায়েত ফকির সময়ের আলোকে বলেন, সবার ওপরে মানুষ সত্য। তাহার ওপরে নাই। লালন বলে গেছেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি’। তাই আমাদের সবার আগে মানুষ হতে হবে। মূল কোথায় সেটা খুঁজতে হবে। তবেই মানুষ তার জীবনের মানে খুঁজে পাবে। একে অন্যকে ভালোবাসব। এর জন্য সবার আগে দরকার গুরুভক্তি। গুরু নিষ্ঠা ছাড়া মানুষ, সর্ব সাধন সিদ্ধ করতে পারবে না- যোগ করেন তিনি।

পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে সাধুসঙ্গ অনুষ্ঠান শেষ হলেও হেমাশ্রমে আসা সাধু ও দর্শনার্থীদের অনেকে রয়ে গেছেন। অনেকে আত্মশুদ্ধি নিয়ে ফিরে গেছেন নিজ নিজ ধ্যানে। যারা রয়ে গেছেন তারা আরও কয়েক দিন গুরুর সান্নিধ্যে থাকবেন। ২০১৬ সালে বাউল সম্রাট লালন শাহের জীবনদর্শন নিয়ে জানতে বাংলাদেশে আসেন দেবোরা কিউকারম্যান। এরপর আটকে যান সেই জীবনদর্শনে। বাউলদের এই জীবনাচারে খুঁজে পান প্রশান্তি। আত্মিক শান্তি ও সৃষ্টি রহস্য খুঁজতে দীক্ষা নিচ্ছেন ফ্রান্সের এই তরুণী।