06:09:05 am
Wednesday, June 24

রাজনীতিতে ধ্বনিত হোক মানুষের কথা

বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ গরম। সরকারি দল বিরোধী দল উভয়ে মিলেই গরম রাখছে মাঠ। ১০ ডিসেম্বর বিএনপির জনসভাকে কেন্দ্র করে মানুষের মনে যে আতঙ্কের জন্ম হয়েছিল সে আতঙ্ক এখনও পুরোপুরি কাটেনি।

বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ গরম। সরকারি দল বিরোধী দল উভয়ে মিলেই গরম রাখছে মাঠ। ১০ ডিসেম্বর বিএনপির জনসভাকে কেন্দ্র করে মানুষের মনে যে আতঙ্কের জন্ম হয়েছিল সে আতঙ্ক এখনও পুরোপুরি কাটেনি। চলছে জনসভা, পাল্টা জনসভা। তুলনামূলকভাবে সরকারি দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগই বেশি জনসভা করছে। দলটির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ব্যানারে প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে কোনো না কোনো জনসভা। দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তৃতা করছেন এসব জনসভায়। 

সাধারণ মানুষ প্রায় প্রতিদিনই পড়ছেন চরম যানজটে। ভুগছেন নানা ভোগান্তিতে। তারপরও জনসভার কমতি হচ্ছে না। সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে সভাসমাবেশ হবে, তবে কোনো রকম নৈরাজ্য সৃষ্টি করা যাবে না। দেশি-বিদেশি নানা চাপের মুখে থেকেও সরকার সব রকম গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষা করে চলছে। বাংলাদেশের মানুষ সবসময় ইতিবাচক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। 

নেতিবাচক রাজনীতি যারাই করেছে তারাই রোষানলে পড়েছে জনগণের। মানুষ এখন আর অতটা ধৈর্য রাখতে পারে না যে দিনের পর দিন বছরের পর বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা চলবে দেশে। ধীরস্থির শান্তভাবে চলতে চায় দেশের মানুষ। অনেক দেখেছে অস্থিরতা। আর দেখতে চায় না। এবার চায় উন্নয়ন অগ্রগতি। মারামারি, হানাহানি, কাটাকাটি করে পিছিয়ে থাকতে চায় না। মানুষ চায় উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে।

এই তাল মিলিয়ে চলার জন্য দরকার স্থিরতা। দেশ যদি রাজনৈতিকভাবে স্থির হতে না পারে তাহলে উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে যাবে। রাজনৈতিক খোঁচাখুঁচির কারণে এক ধরনের অস্থির পরিবেশের সৃষ্টি হয়। যে পরিবেশে কাজকর্ম করা যায় না। ভালো কোনো চিন্তা করার অবকাশ থাকে না। 

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির যে অবস্থা চলছে তাতে মানুষের দুশ্চিন্তা কাটার কোনো অবকাশ নেই। সকালে এক রকম তো বিকালে অন্য রকম। দিনে ভালো তো রাতে ঘোলাটে। এমন একটা দোদুল্যমান অবস্থায় দেশের মানুষ কোন দিকে যাবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে চ্যাপ্টা সাধারণ মানুষ। তার মাঝে যদি আবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হয় তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? কীভাবে চালাবে জীবন? কীভাবে নির্বাহ করবে জীবিকা? 

প্রশ্ন কটি অতি সাধারণ কিন্তু উত্তর বেশ কঠিন। এক কথায় এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে না। কারণ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই নাজুক যে যেকোনো সময় কলাপস করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ আগে নাকি রাজনীতি আগে এই প্রশ্নটা বারবার সামনে চলে আসে। 

ধেয়ে আসা বিশ্ব মন্দার কবল থেকে দেশের মানুষ ও অর্থনীতিকে আগে বাঁচাতে হবে এটাই স্বাভাবিক। স্বাভাবিক কাজটি স্বাভাবিকভাবে না হওয়াটা অস্বাভাবিক। বাংলাদেশে আসলে অস্বাভাবিক কাজই বেশি হয়। যার কারণে দেশের মানুষ কারও ওপর আস্থা রাখতে পারে না। না সরকারি দল, না বিরোধী দল।

কোন দলের ওপর এখন সাধারণ মানুষের তেমন একটা বিশ^াস বা ভরসা নেই। তাই রাজনীতির মাঠ গরম-ঠান্ডা নিয়ে মানুষের কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা চায় শান্তিতে চারটা ডাল-ভাত খেয়ে জীবনধারণ করতে। এই ব্যবস্থা যে সরকার করে দিতে পারবে সে সরকারের পক্ষেই তারা কথা বলবে। সে সরকারকেই ক্ষমতায় বসানোর সব চেষ্টা করবে। 

মানুষের জন্য কাজ না করে শুধু বুলি আওড়ালে মানুষের অসহ্য লাগে। হেন করেঙ্গা তেন করেঙ্গা শোনার সময় ধৈর্য কোনোটাই মানুষের নেই। মানুষ দেখতে চায় কাজ। কাজের বিকল্প কাজই। নানা কর্মসূচি দেওয়ার পর যদি ফলাফল শূন্য হয় তাহলে কোনো লাভ নেই। শুকনো কথায় চিড়ে ভিজে না। গুড় ছাড়া মিষ্টি হয় না। রাজনীতিবিদদের এই কথা বুঝতে হবে। শুধু শুধু ১০ দফা কিংবা ২০ দফা দিয়ে কোনো লাভ নেই। 

মানুষ কী চায়, তাদের কী প্রয়োজন তা অবশ্যই জানতে হবে আগে। তারপর অ্যাকশনে নামতে হবে। খামখা দফা দিয়ে কাজের কাজ কিছুই হবে না। ১০ ডিসেম্বরের জনসভায় বিরোধী দল বিএনপি ১০ দফা দেয়। এই ১০ দফার মাঝে এক-দুটি সাধারণ মানুষের জন্য ছাড়া বাকি সব কটিই দলীয়। দলের নেতাকর্মীদের নয়, সন্তুষ্ট করতে হবে সাধারণ মানুষকে। ১০ ডিসেম্বরের পর বিএনপি ৩০ ডিসেম্বরে রাজধানীতে গণমিছিলের ডাক দিয়েছে। দেখা যাক কী হয়।
 
২৪ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলন হয়েছে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সারা দেশ থেকে এসেছে কাউন্সিলর ডেলিগেট। সবার চোখ ছিল সাধারণ সম্পাদক, প্রেসিডিয়াম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সম্পাদকীয় ও কেন্দ্রীয় সদস্য পদে। খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি এসব পদে। দুয়েকটি ছাড়া। শেখ হাসিনা টানা দশম বারের মতো দলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ওবায়দুল কাদের তৃতীয় বারের মতো সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছেন।

শেখ হাসিনা দীর্র্ঘ ৪২ বছর ধরে সফলতার সঙ্গে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে দল পরিচালনা করছেন। তার নেতৃত্বেই উন্নত, সমৃদ্ধ, আধুনিক, আত্মনির্ভরশীল এবং স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার কাজ চলছে।

এদিকে ১১টি দল নতুন প্লাটফর্ম ‘জাতীয়তাবাদী ঐক্যজোট’ গঠন করেছে। এই ঐক্যজোট ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির ২০ দফার সমর্থনে এবং সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে আলাদা প্ল্যাটফর্মে রাজধানীতে গণমিছিল করবে। জোটে থাকবেন মোস্তফা জামাল হায়দারের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি (জাফর), মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম বীরপ্রতীকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিসহ আরও বেশ কটি দল। 

সব মিলে ডিসেম্বর শেষে জানুযারি ২০২৩-এ বাংলাদেশে একটা আন্দোলন-সংগ্রামের পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জোর চেষ্টা করছে মাঠে থাকা বিরোধী দলগুলো। আন্দোলনে সাধারণ মানুষের লাভ-ক্ষতি কী হবে তা বিচার-বিবেচনা না করলে তা সফল হবে না বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। 

আসলে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামই জনসম্পৃক্ততা ছাড়া সফল হয় না। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ সবকিছুর পেছনেই ছিল গণমানুষের সমর্থন ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। 

যার কারণে এসব আন্দোলন-সংগ্রামে শেষ পর্যন্ত জনতার বিজয় হয়েছে। ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলন একই কারণে সফল হয়েছে। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামই করা যায় না ও সফল হওয়া যায় না। কথাটা সব দলকেই মনে রাখতে হবে। শুধু মনে রাখা নয়, গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। চিন্তায় থাকতে হবে সবার ওপরে দেশ ও দেশের মানুষ।

দলীয় বা ব্যক্তিস্বার্থে রাজনীতির দিন শেষ। পৃথিবীর কোনো দেশেই এই রাজনীতি কার্যকর নয়। রাজনীতির নাম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাধারণ মানুষের চেহারা চোখের সামনে ভাসতে হবে। তাদের জন্য কিছু করার মনোভাব জাগ্রত হতে হবে। তা না হলে জনগণই ছুড়ে ফেলে দেবে আঁস্তাকুড়ে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি কতটা জনবান্ধব তা গবেষণার বিষয়। সরকারি দল বিরোধী দল উভয়কেই এই হিসাব ও গবেষণা করতে হবে। ক্ষমতায় থাকাকালে জনগণকে একেবারেই ভুলে গেলে যেমন নির্বাচনে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে, তেমনি বিরোধী দলে থেকে জনগণকে ভুলে গেলেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। দুদলকেই সাধারণ মানুষের কথা মাথায় রাখতে হবে। মানুষের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে ভাবতে হবে। ভাবনার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। বাস্তবে রূপ দিতে হবে। 

সাধারণ মানুষের চাহিদা খুব বেশি নয়। তারা শান্তিতে তিন বেলা তিন মুঠো ডাল-ভাত পেলেই যথেষ্ট। রাজা-বাদশার মতো চলা বা জীবন চালানোর কোনো ইচ্ছা সাধারণ মানুষের নেই। 

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আসলেই সাধারণ। রাজনৈতিক দলগুলোকে এ কথা মাথায় রেখেই কার্যক্রম চালাতে হবে। কর্মসূচি দিতে হবে। কর্মসূচিতে অবশ্যই সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতিবিম্ব থাকতে হবে। ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হতে হবে মানুষের জীবনের অতি সামান্যতম চাহিদার।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।