চড়া পণ্যমূল্যে বছরজুড়ে কষ্ট
বিদায় নিচ্ছে আরও একটি বছর। বছরটি যাচ্ছে- তবে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য যে সীমাহীন কষ্ট দিয়েছে দেশের মানুষকে, তা ভোলার নয়। বছরজুড়েই চাল, ডাল, তেল, মাছ-মাংস, সবজি থেকে শুরু করে সাবান-সোডা কিংবা টুথপেস্টের মতো খাদ্যবহির্ভূত পণ্যেরও রেকর্ড দাম বেড়েছে। এ কারণে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং স্বল্প আয়ের মানুষের তিন বেলার আহার জোটাতে হিমশিম খেতে হয়েছে।
বিদায় নিচ্ছে আরও একটি বছর। বছরটি যাচ্ছে- তবে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য যে সীমাহীন কষ্ট দিয়েছে দেশের মানুষকে, তা ভোলার নয়। বছরজুড়েই চাল, ডাল, তেল, মাছ-মাংস, সবজি থেকে শুরু করে সাবান-সোডা কিংবা টুথপেস্টের মতো খাদ্যবহির্ভূত পণ্যেরও রেকর্ড দাম বেড়েছে। এ কারণে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং স্বল্প আয়ের মানুষের তিন বেলার আহার জোটাতে হিমশিম খেতে হয়েছে।
বলা হচ্ছে, নতুন বছর-অর্থাৎ ২০২৩ সালটি নাকি হবে দুর্ভিক্ষের বছর। সব কিছু দাম নাকি আরও বাড়বে। এ অবস্থায় আশু সংকট মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করে সরবরাহ চ্যানেল ঠিক রাখারও মতো তাদের।
আগের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে নিত্যপণ্যের মূল্য কোন অবস্থানে ছিল আর ২০২২ সালের ডিসেম্বরে পণ্যমূল্য কোন অবস্থানে রয়েছে- সেদিকে তাকালেই বোঝা যাবে পণ্যমূল্য পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গেছে। খোদ সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করলেও পণ্যমূল্য বৃদ্ধির উত্তাপ বেশ ভালোভাবেই আঁচ করা যাবে। যদিও সাধারণ বাজারের চেয়ে টিসিবির বাজার বিশ্লেণের তথ্যে বেশ তফাত রয়েছে।
টিসিবির তথ্য বলছে, গত বছরের ডিসেম্বরে দেশের বাজারে এক কেজি খোলা আটার দাম ছিল ৩৪-৩৮ টাকা। আর চলতি বছরের ডিসেম্বরে দাম হয়েছে ৬০-৬৫ টাকা। প্যাকেট আটার কেজি ছিল ৪০-৪৫ টাকা, এখন হয়েছে ৭০-৭৫ টাকা। খোলা ময়দার কেজি ছিল ৪৫-৫০ টাকা, এখন ৭০-৭২ টাকা। প্যাকেটজাত ময়দার কেজি ছিল ৫০-৫৫ টাকা, এখন হয়েছে ৮০-৮৫ টাকা। অর্থাৎ গত বছরের ডিসেম্বরের চেয়ে এ বছরের ডিসেম্বরে খোলা আটার দাম বেড়েছে ৭৩ দশমিক ৬১ শতাংশ, প্যাকেটজাত আটার দাম বেড়েছে ৭০ দশমিক ৫৯ শতাংশ, খোলা ময়দার দাম বেড়েছে ৪৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং প্যাকেটজাত ময়দার দাম বেড়েছে ৫৭ দশমিক ১৪ শতাংশ।
এভাবে গত এক বছরের ব্যবধানে চালের মূল্য বেড়েছে গড়ে ৬-৭ শতাংশ, সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ১৮-২২ শতাংশ, ডালের দাম বেড়েছে নিম্নে ১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৪২ শতাংশ পর্যন্ত, মসলা জাতীয় পণ্যের দাম বেড়েছে ৮ থেকে সর্বোচ্চ ৪১ শতাংশ পর্যন্ত, মাছের দাম বেড়েছে ৫-১৫ শতাংশ পর্যন্ত, গুঁড়া দুধের দাম বেড়েছে ২৭-৪০ শতাংশ পর্যন্ত, চিনির দাম বেড়েছে ৪৫ শতাংশ, লবণের দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ এবং ডিমের দাম বেড়েছে ৮ শতাংশ।
সুতরাং বিদায় নিতে যাওয়া বছরটির একেবারে শুরু থেকে শেষ অবধি সারা দেশে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে আর নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়ে নিত্যপণ্যে। করোনার ধকল কাটিয়ে অনেকের বেতনও ফেরেনি আগের অবস্থানে। এরই মধ্যে পণ্যমূল্য বাড়ায় সংসারে টানাপড়েন চলছে সারা বছর। বেশি ভুগেছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ।
চলতি বছরের মাঝামাঝি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলেছিল, পণ্যসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিতে নতুন করে বিপদ পড়েছে ২৯ শতাংশ মানুষ। যেখানে বছরের শুরুতে দেশের ১৮ শতাংশ মানুষের জীবনমানের ওপর সেই চাপ ছিল। আর বছর শেষে এ হিসাব করলে হিসাব নিশ্চয় আরও পরিবর্তন হবে।
যদিও সরকার শেষ সময়ে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার দাবি করেছে, তবে সেটি মানতে নারাজ বিশ্লেষকরা। সব মিলিয়ে বছরজুড়েই দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল বেশ আলোচিত বিষয়। গত আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সব জিনিসের দাম বেড়ে যায়। যে কারণে আগস্ট মাসে উচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা করেছিলেন অর্থনীতিবিদরা।
সেখানে বিবিএসের হিসাবে, গত অক্টোবর মাসে মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৯১ শতাংশে নেমেছে। এর আগে আগস্ট মাসে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়, যা ১১ বছর ৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরে সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১০ শতাংশে নেমেছে। এর আগে ২০১১ সালের মে মাসে সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ২০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়। ২০১১ সালের মে মাসের পর মূল্যস্ফীতি আর কখনোই ৯ শতাংশের বেশি হয়নি।
এদিকে বছরজুড়ে পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলেছে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, বিশ^ব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট ও এর প্রভাবে বাংলাদেশে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে পণ্য আমদানিতে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। এর মধ্যে দেশে এক দফা ডিজেলের দাম বাড়ায় বাড়তি পরিবহন খরচ ও পণ্য উৎপাদনে গ্যাসের সংকটে পণ্য সরবরাহ পরিস্থিতি বছরজুড়ে ছিল নাজুক।
চালের দাম বেড়েছে লাগাম ছাড়া : গত বছর ঠিক এ সময় ৪৬-৪৮ টাকার মধ্যে যেকোনো জাতের মোটা চাল কেনা যেত। এখন সেটা ১০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৫৬-৫৮ টাকা। কোথাও কোথাও ৬০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে সরু চালের দাম (মিনিকেট) ৬০ টাকার মধ্যে ছিল, যা এখন ৭০-৭৫ টাকা। ভালো মানের নাজিরশাইলের দাম ৮০ টাকায় ঠেকেছে। যদিও চাল উৎপাদনের সরকারি তথ্য বলছে, টানা কয়েক বছর দেশে চাহিদার চেয়ে বেশি চাল উৎপাদন হচ্ছে। গত অর্থবছর (২০২১-২২) দেশে চালের উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৬৮ লাখ ৫০ হাজার টন। চলতি মৌসুমেও উৎপাদন হচ্ছে এর কাছাকাছি। সে অনুযায়ী দেশে বছরে প্রায় ১৫-২০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। চাল সংকট আমাদের নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাহিদা মেটাতে আমদানির জন্য মরিয়া সরকার। বেসরকারি খাতকেও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে চাল আমদানির জন্য।
যুদ্ধের প্রভাবে বাড়ে আটা-ময়দার দাম : ২০২১ সালের শেষে প্রতি কেজি খোলা আটার দাম ছিল ৩২-৩৪ টাকা। এখন কিনতে হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকায়। একইভাবে ময়দার দাম ৪০-৪২ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭০-৭৫ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ দুই পণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। টিসিবির তথ্য বলছে, বিগত এক বছরের ব্যবধানে বাজারে আটার দাম ৭৩ শতাংশ বেড়েছে। একইভাবে ময়দার দাম বেড়েছে ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত।
চালের পাশাপাশি আটার দাম বাড়ায় প্রধান দুটি খাদ্যশস্যের জন্যই দারুণ চাপে পড়েছে মানুষ। বাংলাদেশের বাজারে দুটি পণ্যের দামই দাঁড়িয়েছে ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আগে মানুষ চালের দাম বাড়লে বিকল্প হিসেবে আটা-ময়দা বেছে নিত। এ বছর সে সুযোগও নেই।
তেল-চিনিতে অস্বস্তি ছিল সারা বছর : এ বছর তেল ও চিনির দাম সর্বকালের সব রেকর্ড ভেঙেছে। আবার বিভিন্ন সময় দাম বাড়ানোর জন্য সরবরাহ বন্ধ রেখে সংকট তৈরি করেছে কোম্পানিগুলো। সরকারও বারবার দাম বেঁধে দিয়েছে কিন্তু বেশিরভাগ সময় সেটা কার্যকর হয়নি। টিসিবি বলছে, বাজারে সয়াবিন তেলের দাম এখন গত বছরের তুলনায় সাড়ে ২২ শতাংশ বেশি। আর চিনির দাম বেড়েছে সাড়ে ৪৫ শতাংশ। গত বছর এক কেজি চিনির দাম ৭৫ টাকার মধ্যে থাকলেও সেটি এখন ১১৫ টাকা।
স্বস্তি ছিল না সবজি, মাছ-মাংসের দামে : ডিসেম্বরের আগে পর্যন্ত বছরব্যাপী চড়া ছিল সবজির দাম। গরুর মাংসের দাম এক বছরের ব্যবধানে ১০০-১৫০ টাকা বেড়েছে। সঙ্গে চড়া ছিল সব মাছের দাম-ই। বছরের বেশিরভাগ সময় ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজি কেনা যায়নি। একইভাবে বছরের মাঝামাঝি এসে অন্য মাছের মতো সবচেয়ে কম দামি মাছ পাঙাশের দামও বেড়েছে। চাষের পাঙাশ এখন ১৮০ টাকা, দর বেড়েছে কেজিপ্রতি ৩০ টাকার মতো। তেলাপিয়া ১৮০ টাকায় পাওয়া যেত, সেটা এখন ২২০ টাকা। বাজারে বোয়াল, বাছা, কাজলি, চিংড়ি, আইড়, বাতাসিসহ বিভিন্ন দেশি মাছ ৬০০ টাকার নিচে নেই। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাছের দাম বছর ব্যবধানে ২০-৫০ শতাংশ বাড়তি।
বছরজুড়ে চড়া পণ্যমূল্য প্রসঙ্গে বাজার বিশ্লেষক ও কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমার যেটা মনে হয়েছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে একসঙ্গে সব পণ্যের দাম এত অস্বাভাবিক হারে কখনোই বাড়েনি, যে হারে দাম বাড়তে দেখেছি এই ২০২২ সালে। হ্যাঁ, আমিও শিকার করছি করোনার পর ঘুরে দাঁড়ানোর মুহূর্তেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। এ কারণে বিশ^ব্যাপীই পণ্যমূল্য বেড়ে যায়, অনেক দেশেই মূল্যস্ফীতি বাড়ে অস্বাভাবিক কিন্তু আমি মনে করি, যুদ্ধের কারণে আমাদের দেশে পণ্যমূল্য যতটা না বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি বেড়েছে অসাধু ব্যবসায়ীদের মুনাফা লোভের কারণে। এই সংকটের কথা বলে ব্যবসায়ীরা পণ্যমূল্য দ্বিগুণ-তিনগুন বাড়িয়েছে। ফলে দেশের মানুষের রক্ত পানি করা টাকা অতি মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা লুটে খেয়ে আরও সম্পদশালী হয়েছে। পণ্যের বাজারে সরকারের যথাযথ নজরদারি থাকলে ব্যবসায়ীরা এত বেপরোয়া হতে পারত না।’
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর সময়ের আলোকে বলেন, এ বছরটি দেশের মানুষের খুব কষ্টে গেছে- এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। চড়া পণ্যমূল্যের কারণে কখনো এত কষ্ট হয়নি দেশের মানুষের। কেননা এ বছর একসঙ্গে সব ধরনের পণ্যমূল্য দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এখন কথা হচ্ছে- ২০২২ সাল তো অতি কষ্টে দেশের মানুষ পার করল কিন্তু কয়েক দিন পর যে নতুন বছর আসে-২০২৩ সাল সেটি কেমন কাটবে মানুষের তা নিয়ে কেউ কি ভাবছে। আগে থেকেই বলা হচ্ছে ২০২৩ সালে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে কিন্তু দুর্ভিক্ষ হলে সেটি মোকাবিলার জন্য তেমন কোনো প্রস্তুতি আমার চোখে পড়ছে না। এখনও সময় আছে, নতুন বছরের সংকট মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। বিশেষ করে খাদ্য সংকট মোকাবিলার জন্য অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে বিশ^বাজার থেকে পণ্য আমদানি করে পণ্যের সরবরাহ চ্যানেল ঠিক রাখতে হবে।
