06:07:11 am
Wednesday, June 24

ইসলাম মধ্যমপন্থার কথা বলে যে কারণে

মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য মৃত্যুপরবর্তী জীবন ও জান্নাত। আর এ পরম গন্তব্যে পৌঁছার মহাসড়ক হচ্ছে মানবিক ধর্ম ইসলাম, যা সব ধরনের প্রান্তিকতার মাঝখানে অবস্থিত।

মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য মৃত্যুপরবর্তী জীবন ও জান্নাত। আর এ পরম গন্তব্যে পৌঁছার মহাসড়ক হচ্ছে মানবিক ধর্ম ইসলাম, যা সব ধরনের প্রান্তিকতার মাঝখানে অবস্থিত। বিশেষ কোনো জায়গায় তা পক্ষপাতিত্ব করেনি। এ ছাড়া যত মত-পথ আছে সবই প্রান্তিকতা দোষে দুষ্ট। সেসবের অনুসরণ মানুষকে একরোখা করে তোলে ও পাপের পথে ধাবিত করে। পরিণামে মানুষ তার পরম গন্তব্য থেকে দূরে সরে যায়। এভাবে জীবন হয়ে যায় ব্যর্থ। সে ব্যর্থতা থেকে বাঁচতে হলে এবং জীবনকে সার্থক ও পুণ্যময় করে তুলতে হলে তার একমাত্র উপায় মধ্য পন্থার ধর্ম ইসলামের অনুসরণ। বিখ্যাত তাবেয়ি মুতাররিফ ইবনে আবদুল্লাহ তার পুত্রকে লক্ষ করে বলেছিলেন, ‘প্রিয় পুত্র, পুণ্য হচ্ছে দুই পাপের মাঝখানে অর্থাৎ শৈথিল্য ও বাড়াবাড়ির মাঝখানে। সবকিছুর মধ্যাবস্থাই সেরা। সেই গতি অতি মন্দ, যার তীব্রতা বাহনকে ধ্বংস করে।’ (উয়ুনুল আখবার : ১/৩৭৬)

 
ইসলামে সব কাজে মধ্যমপন্থা অবলম্বন মহানবী (সা.)-এর সুন্নত। প্রাচুর্য ও সচ্ছলতা মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক বিশেষ অনুগ্রহ। ইসলামে অপচয় ও অপব্যয় নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি কৃপণতাকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আদম সন্তান, মসজিদে সালাত আদায়ের সময় তোমরা তোমাদের সুন্দর পোশাক পরিধান করবে, আহার করবে এবং পান করবে কিন্তু অপচয় করবে না। কারণ তিনি অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না’ (সুরা আরাফ : ৩১)। অপচয়কারীর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তো তার প্রভুর প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ২৭)


ইসলামের যথাযথ অনুসরণ সব ক্ষেত্রের শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করে। কেননা ইসলাম তার শিক্ষার প্রত্যেকটি ধারায় মধ্যাবস্থার প্রতি লক্ষ রেখেছে। আকিদা-বিশ্বাস, ইবাদত-বন্দেগি, আখলাক-চরিত্র, আচার-ব্যবহার, আয়-ব্যয়, লেনদেন সবকিছুতেই এ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। সুতরাং ইসলামের প্রকৃত অনুসারী তার জীবনের সব ক্ষেত্রে হবে মধ্যমপন্থারই প্রতিকৃতি। সে জন্য প্রথমেই তাকে ইসলামের প্রতিটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে এবং কোনো বিষয়ে ঠিক কী নির্দেশনা ইসলাম দিয়েছে সেদিকে লক্ষ রেখে পথ চলতে হবে, যাতে কোনো ক্ষেত্রেই বাড়াবাড়ি বা শিথিলতাজনিত প্রান্তিকতা ইসলামি জীবনের এ অনন্য বৈশিষ্ট্যকে নস্যাৎ করতে না পারে। পরিমিতি রক্ষা করলে অবসাদ দেখা দেয় না, উদ্যম বজায় থাকে। ফলে ইবাদত স্থায়ী হয়। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আমলের এ পরিমাণই বহন করো, যার ক্ষমতা তোমাদের আছে’ (বুখারি : ৬৪৬৫)। অর্থাৎ যা করতে সক্ষম তা-ই করো। সাধ্যের অতীতে লিপ্ত হতে যেও না। কেননা তা ধরে রাখতে পারবে না। পরিমিত পরিমাণ করলে তা নিরবচ্ছিন্নভাবে করে যেতে পারবে। হাদিসে আরও বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তায়ালার কাছে সেই আমলই বেশি প্রিয়, যা অল্প হলেও স্থায়ীভাবে করা হয়।’ (বুখারি : ৬৪৬৫)

একবার তিন সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রীদের কাছে এসে তাঁর ইবাদত সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তাদেরকে যখন তা জানানো হলো তারা অবাক হলেন। কারণ তার পরিমাণ তাদের ধারণা অপেক্ষা ঢের কম ছিল। তাদের ধারণা ছিল তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে দিবারাত্র নামাজ-রোজাতেই কাটান। কখনো রাতে ঘুমান না এবং কোনো দিন বিনা রোজায় কাটান না। পরক্ষণে তারা ভাবলেন, তাঁর তো এত বেশি ইবাদতের দরকার নেই। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে নিষ্পাপ রেখেছেন, তাঁর কোনো গুনাহ নেই। তাই খুব বেশি ইবাদত করার তাঁর দরকার নেই। অন্যরা তো তাঁর মতো নয়। 


তাদের অনেক গুনাহ হয়ে যায়। তাই তাদেরই বেশি বেশি ইবাদত করতে হবে। সে মতে একজন বললেন, আমি রাতভর নামাজ পড়ব, কখনো ঘুমাব না। দ্বিতীয় জন বললেন, আমি জীবনভর প্রত্যেক দিন রোজা রাখব। তৃতীয় জন বললেন, আমি নারীসঙ্গ পরিহার করে চলব, কখনো বিয়ে করব না। তাদের এ কথা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কানে গেল। তিনি তাদের বললেন, ‘তোমরা এই-এই কথা বলেছ?’ শোনো, আমি কিন্তু আল্লাহকে তোমাদের অপেক্ষা বেশি জানি। তাই তোমাদের অপেক্ষা তাঁকে ভয়ও বেশি করি, অথচ আমি কোনো দিন রোজা রাখি এবং কোনো দিন রাখি না। 

আমি নামাজও পড়ি এবং ঘুমাইও আর আমি বিয়েও করেছি। এটাই আমার সুন্নত ও নিয়ম। যে ব্যক্তি আমার সুন্নত উপেক্ষা করে সে আমার দলের নয়’ (বুখারি : ৫০৬৩)। মধ্যমপন্থা ও পরিমিতি রক্ষা সম্পর্কে এ হাদিস এক সুস্পষ্ট নির্দেশনা। সুতরাং সব বিষয়ে পরিমিতি রক্ষা করাই ইসলামের শিক্ষা।