10:34:08 am
Wednesday, June 24

গাইবান্ধা-৫ উপনির্বাচন : লাঙ্গল-নৌকার প্রেস্টিজ ইস্যু

বহুল আলোচিত গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে আগামীকাল বুধবার। গত ১২ অক্টোবরের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে হাটবাজার ও চায়ের দোকানগুলোতে যেভাবে আলোচনার ঝড় উঠেছিল কিন্তু

বহুল আলোচিত গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে আগামীকাল বুধবার। গত ১২ অক্টোবরের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে হাটবাজার ও চায়ের দোকানগুলোতে যেভাবে আলোচনার ঝড় উঠেছিল কিন্তু বাতিল হয়ে যাওয়া দ্বিতীয় দফায় ভোটগ্রহণের আগে তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে নির্বাচনি এলাকায়।

উপনির্বাচনের উত্তাপে নির্বাচনি এলাকা সরগরম হয়ে ওঠার কথা থাকলেও তা একেবারেই উত্তাপহীন। এবার ভোটকেন্দ্রে ভোটার আনাটাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রার্থীদের। তাই এ নির্বাচনকে ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’ ও ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’ হিসেবে দেখছেন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মী-সমর্থকরা।
গত ১২ অক্টোবরের নির্বাচনে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার ফলে ভোট বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি ভোটারদের মন খারাপের প্রধান কারণ বলে জানান একাধিক ভোটার। তারপরও আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টির সমর্থকরা দিনরাত সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক, ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করেছেন। প্রচার-প্রচারণা শেষে এখন চলছে ভোটের চুলচেরা হিসাব-নিকাশ।

গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মাহমুদ হাসান রিপন, জাতীয় পার্টির এএইচএম গোলাম শহীদ রঞ্জু, বিকল্পধারা বাংলাদেশের জাহাঙ্গীর আলম, স্বতন্ত্র সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী (আপেল মার্কা) নাহিদুজ্জামান নিশাত উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়ে ভোটের মাঠ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে সব নির্বাচনি কৌশল নিয়ে ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছেন বড় দুই দলের নেতাকর্মীরা। ভোটারদের দৃষ্টিতে এখন পর্যন্ত মাঠের লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছে লাঙ্গল ও নৌকা। তবে পিছিয়ে নেই বিকল্পধারা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীও। এ এলাকা একসময় লাঙ্গলের ঘাঁটি বলে পরিচিত ছিল। তবে সেই চিত্র এখন পাল্টে গেছে। সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ লাঙ্গলের পক্ষে থাকলেও সচেতন নাগরিকদের ভোটের হিসাব-নিকাশ উল্টো। তারা চাইছেন এলাকার উন্নয়ন। আর সাধারণ মানুষের আবেগে রয়েছে ‘এরশাদপ্রীতি’। এসব কারণেই এ উপনির্বাচনে নৌকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এখন লাঙ্গল।

ফুলছড়ি উপজেলার ছালুয়া গ্রামের আবদুল সোবহান (৬৫) বলেন, আমাদের দরকার ফজলে রাব্বী মিয়ার মতো একজন মানুষ। এবার আরেকজন ফজলে রাব্বী বানাতে হবে। তাই ভেবেচিন্তে দিতে হবে ভোট।

ফুলছড়ির গণমাধ্যমকর্মী শাহ আলম যাদু বলেন, এ উপনির্বাচনে পাঁচজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে তিনজনই অতিথি পাখি। তাদের মধ্যে একজন ভোট করবেন না ঘোষণা দিয়েছে। অন্য দুই প্রার্থীকে কেবল ভোটের সময় দেখা যায় ফুলছড়ি-সাঘাটা উপজেলায়। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে নৌকা আর লাঙ্গলের মধ্যে। তিনি আরও বলেন, যারা দীর্ঘ সময় ধরে এলাকার উন্নয়নে কাজ করছেন, তাদেরই ভোট দেওয়া উচিত ভোটারদের।

নির্বাচন বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাহমুদ হাসান রিপন বলেন, উপনির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। নৌকা উন্নয়নের প্রতীক। এ প্রতীকে ভোট দিলে দেশের উন্নয়ন হয়। ভোটাররা নৌকায় ভোট দিতে ভুল করবেন না। আমি নির্বাচিত হলে গাইবান্ধার বালাসি থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত টানেল নির্মাণ ও ভাঙনরোধে স্থায়ী ব্যবস্থার উদ্যোগ নেব।

জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী গোলাম শহীদ রঞ্জু বলেন, ১২ অক্টোবর নির্বাচনটি বাতিল হওয়ার মধ্য দিয়ে জনগণের অধিকার আবার ফিরে আসছে। বিগত নির্বাচনের মতো কোনোভাবে প্রভাবিত হবে না এবং সঠিক একটা নির্বাচন উপহার দেবে। সেই বিশ্বাস নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। ভোট যদি সুষ্ঠু, জালিয়াতি-কারচুপি না হয় অবশ্যই প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এরশাদের লাঙ্গল প্রতীককে ভোটাররা বিজয়ী করবেন বলে আমার বিশ্বাস।

এদিকে ভোটকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঝুঁকিপূর্ণসহ কেন্দ্রভেদে ১৬-১৮ জনের ফোর্স মোতায়েন করবে ইসি। সোমবার এ তথ্য জানিয়েছেন ইসির যুগ্মসচিব এসএম আসাদুজ্জামান। 

তিনি জানান, গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনে সাধারণ কেন্দ্রে ১৬-১৭ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭-১৮ জন ফোর্স নিয়োজিত থাকবে। এ ছাড়া ভোটকেন্দ্র পাহারায় পুলিশ, অঙ্গীভূত আনসার ও গ্রাম পুলিশ ভোটের আগে ও পরের চার দিন মোতায়েন থাকবে। পুলিশ, এপিবিএন ও ব্যাটালিয়ন আনসারের ছয়টি ভ্রাম্যমাণ ও চারটি স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকবে ভোটের মাঠে। অন্যদিকে চার প্লাটুন বিজিবি ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) ৯টি দল আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবে। ৯জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও দুজন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পাশাপাশি সংক্ষিপ্ত বিচারকাজ সম্পন্ন করবেন।

ইসির আইডিইএ প্রকল্পের ডিপিডি কমিউনিকেশন স্কোয়াড্রন লিডার মো. শাহরিয়ার আলম সময়ের আলোকে বলেন, গাইবান্ধা-৫ আসনে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছি। এরই মধ্যে নির্বাচনি এলাকায় ১ হাজার ২৪২টি সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এ ছাড়া ২৯টি চর এলাকার মধ্যে সাতটি এলাকায় সরাসরি ফাইবারের মাধ্যমে ইন্টারনেট কানেকশন দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোতে মোবাইল জিএসএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করবে কমিশন।

নির্বাচন কমিশনার রাশেদা সুলতানা সময়ের আলোকে বলেন, সব পক্ষকে নির্বাচন ব্যবস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে ভোটারদের মাঝে আস্থা তৈরি হয় এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। নির্বাচনে দায়িত্বরত কেউ অবহেলা ও পক্ষপাতমূলক আচরণ করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি প্রার্থীদের উদ্দেশে বলেন, প্রচার ও প্রচারণায় আচরণবিধি মেনে চলতে হবে এবং সব পর্যায়ের কর্মকর্তাকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।

সাঘাটা ও ফুলছড়ি দুটি উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গাইবান্ধা-৫ সংসদীয় আসন গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৭৪৩ জন। এর মধ্যে ফুলছড়ির সাতটি ইউনিয়নে ভোটার ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৭৬ জন। আর সাঘাটার ১০টি ইউনিয়নে ভোটার ২ লাখ ২৫ হাজার ৭০ জন। ১৪৫টি কেন্দ্রের ৯৫২টি বুথে ভোট নেওয়া হবে। এবারই প্রথম এ উপনির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএমে) ভোটগ্রহণ করবে ইসি।

এ আসনে স্বাধীনতার পর থেকে ১১টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে পাঁচবার জাতীয় পার্টি, চারবার আওয়ামী লীগ ও দুবার বিএনপি জয়লাভ করেছে।
উল্লেখ্য, গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া গত বছরের ২৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নির্বাচন কমিশন আসনটি শূন্য ঘোষণার পর ১২ অক্টোবর উপনির্বাচনের দিন ধার্য হয়। ভোটে অনিয়ম করায় তা বাতিল করা হয়। 

গত ১৪ নভেম্বর ওই অনিয়মের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। তদন্তে ১২৫ জন প্রিসাইডিং অফিসার ও পাঁচ কেন্দ্রের পাঁচজন পুলিশ উপ-পরিদর্শকের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানান সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল। তদন্ত শেষে গত ৬ নভেম্বর আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশন সচিব জাহাঙ্গীর আলম আগামী ৪ জানুয়ারি গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন।