পোশাক শিল্প খাত: বিশ্বে সবচেয়ে কম মজুরি বাংলাদেশে
তৈরি পোশাক রফতানিতে সারা বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। যা গর্ব করে সবসময় বলেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। অথচ রফতানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দেশটির গার্মেন্টস শ্রমিকরা মজুরি পান প্রতিযোগী
তৈরি পোশাক রফতানিতে সারা বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। যা গর্ব করে সবসময় বলেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। অথচ রফতানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দেশটির গার্মেন্টস শ্রমিকরা মজুরি পান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। প্রতিযোগী অনেক দেশে যেখানে গার্মেন্টস শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ২৪-২৯ হাজার টাকা পর্যন্ত, সেখানে বাংলাদেশে এখনও ন্যূনতম মজুরি মাত্র ৮ হাজার টাকা।
মহামারি করোনার ধাক্কার পর উচ্চ পণ্যমূল্যের কারণে চরম দুর্দশায় দিন কাটছে শ্রমিকদের। এ পরিস্থিতিতে গত তিন বছরের মধ্যে প্রতিযোগী প্রায় সব দেশ শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন করলেও বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা সে বিষয়ে একরকম বিমুখ। তবে শ্রমিকদের স্বার্থে মজুরির বিষয়ে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের বর্তমানে ন্যূনতম মজুরি কত হওয়া দরকার তা নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের এখন গড় ন্যূনতম মজুরি হওয়া দরকার ২১ হাজার ৪১৫ টাকা বা ২০২ ডলার।
শুধু তাই নয়, গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে- ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং আশুলিয়া-নারায়ণগঞ্জের মতো উপশহরে আলাদা আলাদা মজুরি কাঠামো। এতে বলা হয়, ঢাকায় গার্মেন্টস শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি হওয়া দরকার ২১৬ ডলার বা ২২ হাজার ৮৫০ টাকা, ঢাকার আশপাশের উপশহরে ন্যূনতম মজুরি হওয়া দরকার ১৯৮ ডলার বা ২১ হাজার টাকা এবং চট্টগ্রামে ১৯২ ডলার বা ২০ হাজার ৪০০ টাকা।
বিলস সূত্রে জানা গেছে, গত ছয় মাস ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর এবং আশুলিয়া এলাকার গার্মেন্টস শ্রমিক, মধ্য পর্যায়ের কর্মকর্তা, গার্মেন্টস মালিক, বিজিএমইএ নেতা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতের মানুষদের সঙ্গে কথা বলে এই গবেষণা কাজ সম্পন্ন করেছে বিলস। মূল দুই শ্রমিক সংগঠন শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) এবং ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের (আইবিসি) অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এই গবেষণা করে বিলস। গবেষণা কাজ পরিচালনার জন্য অর্থায়ন করে নেদারল্যান্ডভিত্তিক শ্রমিক সংগঠনের জোট এসএনভি। এতে সংগঠনটি প্রায় এক কোটি টাকার মতো ফান্ড দিয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।
এই ফান্ডের একটি অংশ দিয়ে গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি কাঠামোর বিষয়টি গবেষণা করা হয়। পর্যায়ক্রমে গৃহ শ্রমিক ও নির্মাণ শ্রমিকসহ আরও কয়েকটি খাতের শ্রমিকদের মজুরির বিষয়ে গবেষণা করা হবে এই ফান্ডের অর্থ দিয়ে। বিলসের এই গবেষণার একটি অংশে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে গার্মেন্টস শিল্পে বাংলাদেশের প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কাঠামো কেমন- তার চিত্র।
এতে উল্লেখ করা হয়, তুরস্কে গার্মেন্টস খাতে মোট শ্রমিক কাজ করে ৪০ লাখ। দেশটির গার্মেন্টস শ্রমিকরা প্রতি ঘণ্টার হিসাবে মজুরি পায় ১ দশমিক ৪৮ ডলার, আর মাসিক ন্যূনতম মজুরি পায় ৩০৭ ডলার। বাংলাদেশি টাকার অঙ্কে যা দাঁড়ায় ২৯ হাজার ১৬৫ টাকা। দেশটি সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে। ভিয়েতনামে কাজ করে ২৫ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক।
দেশটির শ্রমিকরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি পায় ১৬৮ ডলার বা ১৫ হাজার ৯৬০ টাকা। দেশটি ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করে ২০২২ সালের জুলাইয়ে। ফিলিপাইনে কাজ করে সাড়ে ৫ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক। তাদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ২৪৪ ডলার বা ২৩ হাজার ১৮০ টাকা। দেশটি সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করেছে ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে। মালয়েশিয়ায় কাজ করে ২ লাখ ৬০ হাজারের মতো গার্মেন্টস শ্রমিক। তারা মাসিক ন্যূনতম মজুরি পায় ২৫০-২৭০ ডলার বা ২৩ হাজার ৭৫০ টাকা থেকে ২৫ হাজার ৯৩৫ টাকা। মালয়েশিয়া ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।
আরেক প্রতিযোগী দেশ কলম্বিয়ায় কাজ করে ছয় লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক। তারা ন্যূনতম মজুরি পায় ১৯৪ ডলার বা ১৮ হাজার ৪৩০ টাকা। দেশটি ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ইন্দোনেশিয়ায় কাজ করে ৪২ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক। তারা ন্যূনতম মজুরি পায় ১৩৭ ডলার বা ১৩ হাজার ১৫ টাকা। দেশটি ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করে ২০২২ সালে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করে সাড়ে ৪ কোটি শ্রমিক। তারা ন্যূনতম মজুরি পায় ১২৮ ডলার বা ১২ হাজার ১৬০ টাকা। সেখানে সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করা হয় ২০২০ থেকে ২০২২ সালের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রদেশে। চীনে কাজ করে প্রায় দেড় কোটির ওপরে গার্মেন্টস শ্রমিক। তারা ন্যূনতম মজুরি পায় ২৬২ ডলার বা ২৪ হাজার ৮৯০ টাকা। দেশটি বিভিন্ন প্রদেশে ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করে।
বিলসের ওই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে গ্রার্মেন্টস শিল্পে কাজ করছে ৩২ লাখ শ্রমিক। তারা ন্যূনতম মজুরি পায় ৭৫ দশমিক ৫০ ডলার। টাকার অঙ্কে যা দাঁড়ায় ৮ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১০৬ টাকার হিসাবে)। সুতরাং দেখা যাচ্ছে প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম মজুরি পান বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা। এ জন্যই বিলসের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম গড় মজুরি ২০২ ডলার বা ২১ হাজার ৪১৫ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, দ্রুত নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মজুরি কাঠামো ঘোষণা দেওয়ারও প্রস্তাব করা হয়েছে বিলসের গবেষণায়।
বিলসের গবেষণায় যে ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, ঢাকায় চারজনের একটি শ্রমিক পরিবারে মাসিক খাবার বাবদ খরচ হয় ১৪ হাজার ৩৩০ টাকা, ঘর ভাড়া বাবদ খরচ ১০ হাজার টাকা, খাদ্য ও ভাড়াবহির্ভূত ব্যয় ৭ হাজার ৪৪৯ টাকা, চিকিৎসা ব্যয় ১ হাজার ২৮৭ টাকা, শিক্ষা ব্যয় ১ হাজার ২৫৬ টাকা, পোশাকসহ অন্যান্য ব্যয় ৪ হাজার ৯০৬ টাকা এবং মাসিক সেভিংস ১ হাজার ৫৮৯ টাকা।
সব মিলিয়ে দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৩৬৮ টাকা। কিন্তু যেহেতু অধিকাংশ পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দুজনই শ্রমিক হিসেবে কাজ করে সেহেতু ১ দশমিক ৪৬ জন ফ্যামিলি ইনকাম আর্নার ধরে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি দাঁড়ায় ২২ হাজার ৮৫৫ টাকা। আর বিলসের গবেষণায় প্রস্তাব করা হয়েছে ২২ হাজার ৮৫০ টাকা। প্রায় একই হারে ঢাকার আশপাশের উপশহর এবং চট্টগ্রামেও মজুরি কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিলস ইতিমধ্যেই তাদের এ গবেষণা সম্পন্ন করেছে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবে। তার আগে গবেষণাপত্রটি সময়ের আলোর হাতে এসেছে। জানা গেছে, এটি মজুরি বোর্ড, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও শ্রম মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন দফতরে দেওয়া হবে।
বিলস এ প্রস্তাব করলেও এই মুহূর্তে গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর সক্ষমতা শিল্প মালিকদের নেই বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান। গতকাল তিনি সময়ের আলোকে বলেন, শিল্প মালিকরাসহ সারা দেশ এখন একটি কঠিন সময় পার করছে। এই সংকটের সময় নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা দেওয়া দূরের কথা বর্তমান মজুুরি দেওয়াই অনেক মালিকের কাছে কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন শিল্পকে টিকিয়ে রাখাই কঠিন, বেতন বাড়াবো কীভাবে। পোশাক শিল্পের সে সক্ষমতা এখন নেই যে ন্যূনতম মজুরি ২২ হাজার টাকা দেওয়া যাবে।
তবে শ্রমিক নেতারা বলছেন, শিল্প মালিকরা তো ভালোই আছেন, তাদের ব্যবসাও এখন ভালো যাচ্ছে। পোশাক রফতানিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে- তাহলে নতুন মজুরি কাঠামো দিতে সমস্যা কোথায়।
এ বিষয়ে শ্রমিক নেতা ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তৌহিদুর রহসমান সময়ের আলোকে বলেন, পণ্যমূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে বিগত কয়েক বছরে। শ্রমিকদের তো আর মজুরি বাড়েনি। তাহলে তারা কীভাবে বাঁচবে। কঠিন দুর্দশার মধ্যে গার্মেন্টস শ্রমিকদের এখন দিন পার করতে হচ্ছে। সুতরাং বিলসের গবেষণায় যে ন্যূনতম মজুরির প্রস্তাব করা হয়েছে তা যুক্তিসঙ্গত এবং সময়োপযোগী। আমরা মনে করি, যদি শিল্প মালিকদের একার পক্ষে পুরো অর্থ দেওয়ার সক্ষমতা না থাকে তাহলে সরকার শ্রমিকদের জন্য ভর্তুকি দিতে পারে। রেশন হিসাবে চাল-ডাল ও তেল-চিনি দিতে পারে। তাহলে তো মালিকদের ওপর কিছুটা চাপ কমবে।
