লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি চট্টগ্রাম বন্দর
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি, ডলার সংকট, এলসি খোলায় ব্যাংকের কড়াকড়ি ও বৈশ্বিক মন্দার কারণে আমদানি-রফতানি কমে যাওয়ায় চলতি বছর কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি চট্টগ্রাম বন্দর।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি, ডলার সংকট, এলসি খোলায় ব্যাংকের কড়াকড়ি ও বৈশ্বিক মন্দার কারণে আমদানি-রফতানি কমে যাওয়ায় চলতি বছর কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি চট্টগ্রাম বন্দর। ফলে লয়েডস লিস্টে বৈশ্বিক ক্রমতালিকায়ও পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন মত চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের।
তাদের মতে, প্রতিবছর মাঝামাঝি সময়ে লয়েডস লিস্টে বৈশ্বিক ক্রমতালিকা প্রকাশ করা হয়। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়েও এ তালিকা প্রকাশ করা হবে। এতে চট্টগ্রাম বন্দর কয়েক ধাপ পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২১ সালে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে রেকর্ড গড়েছিল চট্টগ্রাম বন্দর। সে সময় কন্টেইনার পরিবহনের বৈশ্বিক তালিকায় তিন ধাপ এগিয়েছিল অর্থনীতির স্বর্ণদ্বারখ্যাত এ বন্দর। কিন্তু চলতি বছরের শেষ চার মাসে কন্টেইনার পরিবহনে লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি। ফলে লয়েডস লিস্টে বর্তমান অবস্থান ধরে রাখা নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, ১৯৭৭ সাল থেকে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং শুরু হয় চট্টগ্রাম বন্দরে। ২০২১ সালের মতো বিপুলসংখ্যক কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড নেই বন্দরের। ওই বছর ৩২ লাখ ১৪ হাজার ৫৪৮ একক কন্টেইনার পরিবহন হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক তালিকায় তিন ধাপ এগিয়ে ৬৪তম অবস্থান দখলে নেয় চট্টগ্রাম বন্দর।
২০২০ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৮ লাখ ৩৯ হাজার একক কন্টেইনার। ওই বছর ৫৮তম স্থান থেকে ৯ ধাপ পিছিয়ে ৬৭তম স্থানে চলে যায় চট্টগ্রাম বন্দর। ২০২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই বন্দরে ৩১ লাখ ৩৩ হাজার ২০ একক কন্টেইনার পরিবহন হয়েছে। অর্থাৎ গত বছরের চেয়ে চলতি বছর ৮১ হাজার ৫২৮ একক কন্টেইনার কম হ্যান্ডলিং হয়েছে।
২০২২ সালের চিত্র বিবেচনা করলে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩২ লাখ ৫০ হাজার একক কন্টেইনার। তাই ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে লয়েডস লিস্ট প্রকাশিত হলে সেখানে বৈশ্বিক ক্রমতালিকায় পিছিয়ে পড়বে চট্টগ্রাম বন্দর।
আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে স্থবিরতা নামায় প্রভাব পড়েছে প্রাইভেট আইসিডিগুলোতেও। বেসরকারি ডিপোগুলোর মাধ্যমে যেসব পণ্য রফতানি হয় তার অধিকাংশই পোশাক। বর্তমানে পর্যাপ্ত কার্যাদেশ না থাকায় চট্টগ্রামের পোশাক কারখানাগুলোও সংকটময় সময় পার করছে। পোশাক রফতানি কমে যাওয়ার কারণেও ডিপোগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
গত বছর চট্টগ্রামের বেসরকারি ১৯টি ডিপোতে ৩ লাখ ৩ হাজার আমদানি ও ৭ লাখ ৯০ হাজার রফতানি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়। অন্যদিকে চলতি বছর ২ লাখ ৩৭ হাজার আমদানি ও ৭ লাখ ৩৫ হাজার রফতানি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয় চট্টগ্রাম বন্দরে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ও বেসরকারি ডিপোগুলোতে পণ্য পরিবহনে ধাক্কা লেগেছে।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) সভাপতি নুরুল কাইয়ুম খান বলেন, আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ৯২ শতাংশ জাহাজীকরণ প্রক্রিয়া ১৯টি বেসরকারি ডিপোতে সম্পন্ন হয়। পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি কমে গেছে। ফলে রফতানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদনেও ভাটা পড়েছে।
বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে আমাদের প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ ব্যবসা কমে গেছে। আমদানি-রফতানি কমায় স্বাভাবিকভাবেই বন্দরে পণ্য পরিবহনও কমে গেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি, ডলার সংকট, এলসি খোলায় ব্যাংকের কড়াকড়ি ও বৈশ্বিক মন্দার কারণে আমদানি-রফতানি কমে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত কার্যাদেশ নেই। নতুন বছরের মাঝামাঝি সময়েও পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক হয় বোঝা যাচ্ছে না।
বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, ডলারের রিজার্ভের কমতি দেশীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সেই প্রভাব পড়েছে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যেও। ফলে চলতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং কম হয়েছে।
তবে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান বলেছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও দেশে ডলারের সংকটের মধ্যে দেশে আমদানি-রফতানি কমে গিয়েছিল। তারপরও রেকর্ড সংখ্যক কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে। পাশাপাশি ৩ মিলিয়ন কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ডও ধরে রেখেছে চট্টগ্রাম বন্দর। এ অর্জনের পেছনে সমানভাবে অবদান ছিল সব বন্দর ব্যবহারকারীর। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কারণে বন্দর আজ এতদূর এগিয়ে গেছে।
বন্দর চেয়ারম্যান আরও বলেন, আগের চেয়ে আমাদের কি গেন্ট্রি ক্রেন বেড়েছে। ইয়ার্ডের স্পেস বেড়েছে। ক্রমান্বয়ে বন্দরের ইলংইপমেন্ট বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে আমাদের প্রোডাক্টিভিটি বহুগুণ বেড়ে গেছে। ভবিষ্যতে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল পুরোদমে চালু হলে বন্দরের সক্ষমতা আরও অনেক বেড়ে যাবে। তখন প্রবৃদ্ধির হার আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, বিশ্ববাসীর কাছে চট্টগ্রাম বন্দর ঈর্ষণীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। কারণ সারা বিশ্বে যেখানে করোনা মহামারির ফলে বন্দরগুলো বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং তাদের কার্যক্রম সংকুচিত করা হয়েছিল, সেখানে চট্টগ্রাম বন্দর চলেছে এর নিজস্ব গতিতে। চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও লকডাউনে বন্দর এক দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়নি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বন্দর কর্মকর্তারা কাজ করেছেন।
২০২১ সালের তুলনায় সদ্যবিদায়ি ২০২২ সালে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ২০২২ সালে কার্গো হ্যান্ডলিং হয় ১১ কোটি ৯২ লাখ ৭৬ হাজার ২৬২ মেট্রিক টন। এর আগে ২০২১ সালে এর পরিমাণ ছিল ১১ কোটি ৬৬ লাখ ১৯ হাজার ১৫৮ মেট্রিক টন। ফলে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ২ দশমিক ২৮ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২২ সালে ৪ হাজার ২০৯টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করলেও ২০২২ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ হাজার ৩৪৪টিতে। ফলে জাহাজ হ্যান্ডলিংয়েও প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ২১ শতাংশে।
বন্দরের তথ্য মতে, চট্টগ্রাম বন্দরে ৫৩ হাজার টিইইউএস কন্টেইনার রাখার ধারণক্ষমতা রয়েছে। তবে স্বাভাবিক সময়ে ৪০ হাজারের বেশি কন্টেইনার থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে সেখানে ২৭ হাজার ৮০০ টিইইউএস কন্টেইনার রয়েছে।
