নির্বাচনি ইশতেহারে কতটা প্রতিশ্রুতি পূরণ করল আওয়ামী লীগ
টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার পরিচালনা করছে আওয়ামী লীগ। সর্বশেষ গত ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দলটির ইশতেহারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’।
টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার পরিচালনা করছে আওয়ামী লীগ। সর্বশেষ গত ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দলটির ইশতেহারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’। একই সঙ্গে দেশবাসীকে দিয়েছিল অনেকগুলো প্রতিশ্রুতি। সেসব প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়ন করতে পেরেছে দলটি তার হিসাব-নিকাশ চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
এরই মধ্যে ঘনিয়ে আসছে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের সময়। চলতি ২০২৩ সাল নির্বাচনি বছর। স্বভাবতই গত নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি পূরণ হওয়া-না হওয়া নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ গত নির্বাচনে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে সবকিছু আসলে মাত্র পাঁচ বছরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তারপরও গত ২০০৯ সাল থেকে সরকারের ধারাবাহিকতা থাকায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ স্লোগানের বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয়েছে। এখন গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ আছে। এতে গ্রামে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার সরকারে আসার আগে দলটির নির্বাচনি ইশতেহারের ঘোষণা ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার। দেশ ডিজিটাল হয়েছে।
তারা বলেন, ‘তারুণ্যের শক্তি-বাংলাদেশের সমৃদ্ধি’ স্লোগানে তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অঙ্গীকার ছিল ইশতেহারে। ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্ম শতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে জাতি যে সময় স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করে তখনই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করে। নির্বাচনি ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ, জাতীয় সংসদকে কার্যকর করা এবং সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ ও মাদক নির্মূলের অঙ্গীকার করেছিল আওয়ামী লীগ। এতে আরও ছিল, মেগা প্রকল্পগুলোার দ্রুত ও মানসম্মত বাস্তবায়ন, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সুদৃঢ় করা, সার্বিক উন্নয়নে ডিজিটাল প্রযুক্তির অধিকতর ব্যবহার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, দক্ষ ও সেবামুখী জনপ্রশাসন, জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, ব্লু-ইকোনমি-সমুদ্রসম্পদ উন্নয়ন, নিরাপদ সড়কের নিশ্চয়তা দিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার। এর বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে নির্বাচনি ইশতেহারে বলা হয়েছিল পাঁচ বছরে ১ কোটি ২৮ লাখ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে গত চার বছরে প্রায় ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে ৭-৮ লাখের বেশি লোকের কর্মসংস্থান হয়নি।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য (ভিসি) আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সময়ের আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের ২০১৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে মূল যে প্রতিশ্রুতি ছিল সেটি পূরণ হয়েছে। তবে ২০২০ সালে করোনা সংক্রমণের কারণে কিছুটা স্থবির ছিল। তারপরেও প্রতিশ্রুতিগুলো এখনও বাস্তবায়ন হচ্ছে। এখনও আরও এক বছর বাকি রয়েছে। আশা করছি, এ সময়ের মধ্যে আরও পূরণ হবে। ইতিমধ্যে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে গ্রামের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ বেড়েছে। এখন তিন ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় আসতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন সবদিক থেকেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়েছে। একসঙ্গে ১০০ সড়ক ও ১০০ সেতু উদ্বোধন হয়েছে। তবে কর্মসংস্থানের বিষয়টি আমি ঠিক বলতে পারব না। তারপরেও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শূন্যপদে নিয়োগ তো চলছেই। তবে সব প্রতিশ্রুতি একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণ প্রসঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমার গ্রাম আমার শহর’-এর অর্থ হলো প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। এটি ছিল একটি সময়োপযোগী ও অত্যন্ত প্রশংসনীয় অঙ্গীকার। এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে একসময় অবহেলিত দেশের উত্তরাঞ্চলে এখন আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। এখন আর কোথাও ছনের ঘর নেই। সড়ক দিয়ে যেতে যেতে এখন চোখে পড়ে কেবলই পাকা ঘর। আর পদ্মা সেতু হওয়ায় এখন দক্ষিণাঞ্চলেও উন্নয়ন শুরু হয়েছে। এখন আর দেশের কোনো অঞ্চলে যেতে ৬-৭ ঘণ্টার বেশি লাগে না। খাদ্য নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, শিল্প, শ্রমিকদের কল্যাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ, ডিজিটাল বাংলাদেশ, যোগাযোগ, পরিবেশ, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, শিশু ও বয়স্কসহ মুক্তিযোদ্ধা এবং শারীরিকভাবে অক্ষমদের কল্যাণ, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রের অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন প্রায় ৭০ ভাগের কাছাকাছি। তবে আগামীতে আরও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে আওয়ামী লীগকে। প্রতিটি ঘরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার কথা ছিল ইশতেহারে। সেটি হয়তো সরকার পারেনি। আসলে পাঁচ বছরে একটি সরকারের পক্ষে সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।
নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী আওয়ামী লীগের প্রতিশ্রুতি পূরণ বিষয়ে নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন এলেই প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তারা কোনো কাজ করে না। এটা নির্বাচনে পাস করার কৌশল হিসেবে দিয়ে থাকে। এর আগে আওয়ামী লীগ দিনবদলের সনদ দিয়েছিল। কোথায় দিনবদল হয়েছে। রাজনীতিতে এখন অনাচার ও দুর্বৃত্তায়ন জেঁকে বসেছে। তারা বলেছিল, রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন থাকবে না। দলীয়করণ থাকবে না। গণতন্ত্র শক্তিশালী করা হবে। স্থানীয় সরকার আরও শক্তিশালী হবে। কিন্তু এগুলো এখন তাদের কাছে গুরুত্বহীন। রাজনীতি এখন আর জনকল্যাণে নেই। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। আর তারা যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এগুলো ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই নয়। ভোট নেওয়ার জন্য নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা এবং অঙ্গীকারের কথা বলতে হয়, তাই বলে।
তবে গত ২০১৮ সালের দেওয়া নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে জানিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফর উল্ল্যাহ বলেন, গত নির্বাচনে ইশতেহারের অঙ্গীকার একে একে বাস্তবায়ন হচ্ছে। এখন বিরোধীদল সংসদে বেশি কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে উপস্থিত থেকে বিরোধীদলের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছেন, যার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে সরকারের ছোঁয়া লাগেনি।
