আগুন পাহাড়ে হাইকিং
নিকারাগুয়ার এ ট্রইল এসপানিওল ভাষায় ‘করডিলেরা ডে লস মারাবিওস্’ বা ‘মার্ভেলাস ভলকানিক চেইন’ বলে পরিচিত। পর্বতের এ রিজ থেকে মমোতমবিতো, সেরো-নেগ্রো, টালিকা ও এল-হয়ো নামে বেশ কয়েকটি ভলকানো একসঙ্গে দৃশ্যমান হওয়ার কথা।
নিকারাগুয়ার এ ট্রইল এসপানিওল ভাষায় ‘করডিলেরা ডে লস মারাবিওস্’ বা ‘মার্ভেলাস ভলকানিক চেইন’ বলে পরিচিত। পর্বতের এ রিজ থেকে মমোতমবিতো, সেরো-নেগ্রো, টালিকা ও এল-হয়ো নামে বেশ কয়েকটি ভলকানো একসঙ্গে দৃশ্যমান হওয়ার কথা। ব্লাডরেড সানরাইজের মোলায়েম কিরণে মোমের শিখায় পুড়ে যাওয়া মসলিনের নেকাবের মতো উবে যাচ্ছে কুয়াশার ঊর্ণনাভ। একটি পাথরের ওপর বসে প্রভাতী আলো মাখতে মাখতে জিভ বের করে রং বদলায় সবুজে নীলাভ ময়ূরকণ্ঠীর ঝিলিক দেওয়া গিরগিটি। ভলকানোগুলোর গা-গতর, পাথুরে চূড়া কিংবা বাষ্পময় ক্রেইটার কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আমরা কি সঠিক ট্রেইলে আছি- এ সংশয়ের ভেতর প্রেক্ষাপটজুড়ে কয়লাখনির পাথরকুচি ছড়ানো কালচে দগ্ধতা নিয়ে ভেসে ওঠে জ্বলাপোড়া আগ্নেয়গিরি সেরো-নেগ্রো।
‘ডনডে ইসটান লস অতরস্ ভলকানেস?’ বা ‘অন্য আগুন পাহাড়গুলো কোথায়?’ বলে ইসাবেল উদ্বিগ্ন মুখে কম্পাসের কাঁটা অ্যাডজাস্ট করলে, অন্য হাইকার ম্যাথু পাথরে প্রোথিত কোনো প্রাণীর পাঁজরের আকৃতির দিকে তাকিয়ে স্পষ্টত সংশয় প্রকাশ করে এসপানিওলে বলে, ‘ক্রেয়ো কে এসতামস পারদিদস’, বা ‘মনে হয় আমরা পথ হারিয়েছি?’ ইসাবেল এবার হাইকিংয়ের হাল ধরে বলে, ‘নস এনকনত্রামস নোয়েসত্রো কামিনো, লেটস মুভ বয়েস, হাইক করতে করতেই আমরা খুঁজে নেব আমাদের ট্রেইল।’ মাত্র মিনিট বিশেকের ওয়ার্মআপ হাইকে দিগন্তে জাহাজের মাস্তুলের মতো এল-হয়ো আগ্নেয়গিরির খানিক দেখা গেলে বুঝতে পারি, আমরা যে পথ ধরে চলছি এ ট্রেইল সম্পূর্ণ সঠিক না হলেও ইসাবেলের দিক নির্ণয়ে ভুল হয়নি। আমরা রিলাক্স ফিল করি। ইসাবেল সেরো-নেগ্রো আগ্নেয়গিরির পাঁজর থেকে গড়িয়ে নেমে আসা ঢালের দিকে নিশানা করে আরেক দফা হাইকের উদ্যোগ নেয়। ভিজিবিলিটি এখনও তেমন পরিষ্কার নয়, তাই আমরা মনোযোগী পদক্ষেপে তার পেছন পেছন হাঁটি।
আগ্নেয়শিলাকে এখানে প্রকৃতি এমনভাবে অ্যারেঞ্জ করেছে যে, মনে হয় এদিকে তৈরি হয়েছে অশ্বক্ষুরাকৃতির একটি গুহার। তার আবডালে বাতাস বাঁচিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে ইসাবেল। সে প্রসাধনের ছোট্ট গোলাকার পকেট-আয়নায় ছড়ানো কিছু মিহি শ্বেতকায় পাউডার কোল্ডড্রিংকসের স্ট্রো দিয়ে টেনে নেয় নাসারন্দ্রে। সালফারের দাগ লাগা পেল্লায় একটি পাথরে বসে ম্যাথু ঘোরলাগা বিষণœ স্বরে গুনগুনিয়ে গায়- ‘আই ওয়ানা মেইক মাইসেল্ফ ক্রাই।’ আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই- নিচের ঢালু উপত্যকা, সবুজ বনানী ও ডোমের মতো গোলাকার সব আগ্নেয়গিরির পাথুরে রিম ছড়িয়ে, দিগন্তের দিকে উড়ে চলা স্টানিং ভিউ’য়ের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে সে বলে, ‘বাডি, ইজ নট্ ইট অ্যা চার্মিং সিটি?’ আমি ঘাড় বাঁকিয়ে প্রায় নয়শ ফুট উঁচু থেকে দাবার ছকের মতো সাজানো, চারশ বছরের পুরোনো স্প্যানিশ উপনিবেশ যুগের শহর লেয়নকে দেখি। আগ্নেয়গিরির ডোমগুলো পাড়ি দিয়ে হঠাৎ সূর্য সার্চলাইটের মতো ধাঁধিয়ে দেয় আমাদের চোখ-মুখ। ইসাবেল চোখে গোগুলস এঁটে রুমালে নাক মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়ায় আরেকটি আগ্নেয়শিলার ওপর।
ইসাবেলের সঙ্গে আমার সম্পর্ককে দ্বন্দ্বাত্মক বলা চলে। যদিও আমরা পরস্পরকে পছন্দ করছি না এক বিন্দু, তারপরও এ উইকেন্ডে তার ওপর আমার ও ম্যাথুর নির্ভরশীলতা আরও বেড়েছে বই কমেনি। গাইড ভাড়া করে একা গাড়ি হাঁকিয়ে আগুন পাহাড়ে হাইক করার মতো আর্থিক সঙ্গতি আমাদের কমে আসছে। ইসাবেল মোটর মেরামতের কাজ জানে। সে গ্যারেজে গিয়ে অকেজো হয়ে পড়ে থাকা একটি উইলিস জিপ সারাই করে তা মালিকের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছে খুব কম পয়সায়। আমরা তা শেয়ারে চড়ছি। তার ওপর ইসাবেলের মানচিত্র পাঠে দক্ষতা অশেষ। তার কব্জিতে বাধা জিপিএসের নির্দেশনা অনুসরণ করে আমরা আজ হাইকে বেরিয়েছি। নিকারাগুয়ার উষ্ণম-লীয় আবহাওয়ায় তীব্র রোদে পাহাড় চড়লে এনার্জিও ক্ষয় হয় দ্রুত। তাই আমরা ভোর ৫টার দিকে রওনা হয়ে ঘণ্টাখানেকের হাইকে চলে এসেছি সেরো-নেগ্রো আগ্নেয়গিরির উত্তর দিকে। এখান থেকে শিখর কিন্তু খুব বেশি দূরে নয়। নামার পথে কাঠকয়লার চূর্ণ, বালুকা ও হাজার বছরে ক্রমাগত ভাঙচুর হতে থাকা আগ্নেয়শিলা ঝরঝর করে নিচের দিকে ঝরে পড়তে শুরু করলে আমাদেরও হাইক করতে হয় পা টিপে টিপে, ট্রেকিং স্টিকে ভর দিয়ে দিয়ে খুব সাবধানে। শিখরের আইসক্রিম কৌনের আকৃতির স্তম্ভ ক্রমশ দৃষ্টি থেকে দূরে সরে গেলে আমরা চলে আসি আগুন পাহাড়ের পশ্চিম প্রান্তে। এখান থেকে দেখি, বেশ নিচে কালচে-খয়েরি হলুদাভ এক ক্রেইটার। না, সরাসরি ক্রেইটারের দিকে যাওয়ার কোনো ট্রেইল নেই। তাই আমাদের পথ চলতে হয় ঘুরপথে। বেশ কিছু শিলাপাথর অতিক্রম করে বাঁক নিতেই নীলাভ রুপালি আলোয় ভরে যায় আমাদের দৃষ্টিপথ।
বেজায় তাজ্জব হয়ে আমরা কিছ্ক্ষুণ দম ধরে দাঁড়িয়ে থাকি। প্রজাপতির লীলায়িত এক ছায়াপথ উড়ে যাচ্ছে আগুন পাহাড়ের ঢাল অতিক্রম করে দূরের কোনো গিরিপথের দিকে। ‘মারিপোসা আসুল’ বা ‘নীল প্রজাপতি’ নামে পরিচিত এ পতঙ্গের ডানায় স্ফটিকের রুপালি বৃত্ত- তাতে প্রতিসরিত হচ্ছে ভোরের আলো; আর তারা প্রকৃতির হাজার-বিজার উড্ডীন ফুল হয়ে বাতাসে ধূমকেতুর মতো কু-ুলায়িত হতে হতে আগুন পাহাড়ের কৃষ্ণাভ ল্যান্ডস্কেপে এঁকে দিচ্ছে সর্পিল নীলাভ রেখা। জানতাম এ মৌসুমে প্রজাপতিরা পরিযায়ী হয়, কিন্তু তাদের যাত্রাপথে এসে দাঁড়াব তা তো কখনো ভাবিনি। আচরণে সচরাচর ইসাবেল বেজায় খরখরে রুখুসুখু গোছের নারী; প্রজাপতি চলাচলের এ দৃশ্যে তাকেও ইমোশনাল হতে দেখে একটু অবাক হই! এ যাত্রায় প্রথমবারের মতো তার মুখে হাসি ফুটে। ‘হোয়াট অ্যা ওয়ান্ডারফুল ভিউ, দিজ ব¬ু বাটারফ্লাইজ উইল বি সো মেমোরেবোল, অ্যাবসোলিউটলি ডিভাইন’, বলে ইসাবেল আমার হাত ধরে। রুপালি নীল প্রজাপতিদের উড্ডয়ন রেখা ক্রমশ অপসৃয়মাণ হচ্ছে গিরিপথের আবডালে, আর ভাসমান মেঘমালায় আঁকিবুঁকি কাটছে সূর্যের সোনালি আলো; আমি মুখ ফিরিয়ে এসব দেখতে দেখতে তার হাত থেকে ছাড়িয়ে আনি আমার হাত।
কালচে-খয়েরি-হলুদাভ ক্রেইটারে পৌঁছতে হলে আমাদের পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ। সূর্য তেতে উঠার আগে পৌঁছতে পারলে এনার্জি বাঁচে বিস্তর। তাই আমি হাঁটতে শুরু করলে ইসাবেল ও ম্যাথু আমাকে অনুসরণ করে। আমি চেষ্টা করি ইসাবেলের সঙ্গে আই কন্টাক্ট না করতে। কিন্তু সে আমার পাশেপাশে হাঁটছে। তার সঙ্গে আমার চূড়ান্ত বিরোধের সূত্রপাত হয় কালরাতে। সস্তা পানশালার সুইমিংপুলের পাশে আমি ও ম্যাথু বসেছিলাম। আমার ল্যপটপে প্রিজার্ভ করা পুরোনো দিনের হিন্দি কিছু গান ম্যাথুর খুব মনে ধরেছে, সে বারবার মৃদু স্বরে বাজিয়ে গিটারে তুলে নিচ্ছে,‘আপনা দিল তু আওয়ারা, না জানি কিসিকো।’
দিব্যি রিলাক্স পরিবেশ, ঠিক এ সময় চার্চের সান্ধ্যকালীন সার্ভিস থেকে ফিরে আসে ইসাবেল। তার খরখরে চেহারায় চোখ দুটি জ্বলজ্বল করছে অস্বাভাবিকভাবে। চার্চে প্রার্থনার পর কার কাছ থেকে সে কিছু কোকেন কিনে এনেছে। রাংতায় মোড়া মিহি শুভ্র পাউডারের পুরিয়া দেখাতে দেখাতে যেন মেছোপেতিœ বাজার ফেরতা কারও কালিবাউস বাগিয়েছে- এ রকমের অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে তার চোখেমুখে। এখন তার আবদার হচ্ছে, যেহেতু কোকেন ক্রয় বাবদ তার খরচ হয়েছে বিস্তর, আমরা যেন তার কস্ট শেয়ার করি এবং তার সঙ্গে এ বস্তু সেবনও করি। আমি টাকা-পয়সার সংকটের কথা তুলে প্রস্তাব সরাসরি রিফিউজ করি। কিন্তু ম্যাথু সাতপাঁচ ভেবে কোকেনের কস্ট শেয়ার করতে রাজি হয়। অতঃপর তারা চলে যায় জেসমিন কুঞ্জের আবডালে তা সেবন করতে। আমি একা বসে থেকে ল্যাপটপে মুকেশের গান শুনি। একটু পর দুজনে ফিরে এলে ইসাবেল আমার দিকে শাকচুন্নির মতো শাণিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, ‘ইউ আর ওয়ান আনসোশ্যাল উইয়ার্ড বাসটার্ড।’ প্রতিক্রিয়ায় আমি তাকে এসপানিওল ভাষায়, ‘কুঁতকুঁতে কোনো কোকেনহেডের সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি না’ জানালে সে ম্যাথুর হাত ধরে টানতে টানতে বলে, ‘ইউ আর ফ্রম ইন্ডিয়া, আই নো ম্যান ফ্রম সাবকন্টিনেন্ট অ্যা লিটল বিট্, লিসেন আনসোশ্যাল আই হেইট্ ইউ।’
আমরা সেরো-নেগ্রোর কাছাকাছি পাহাড়ের রিজ থেকে নেমে আসি বেশ দ্রুত। শরীরে এ ভোরবেলাও ঘাম হচ্ছে বিস্তর। আগ্নেয়শিলার অশ্বক্ষুরাকৃতির কেইভ ফর্মেশনের কাছে এসে ম্যাথু পানি পানের বিরতির প্রস্তাব করে। আমরা ঝামা পাথরে বসে লবণ দেওয়া শসা খাই। তারপর পাথরের আড়ালে গুহায় গিয়ে বাতাস বাঁচিয়ে ইসাবেল একা কোকেন নেয়। সে এখন পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে চোখ থেকে গোগুলস্ খুলে নিয়ে সরাসরি আমার দিকে তাকায়। তার দৃষ্টিতে টর্চবাতির বাল্ভের মতো উজ্জ্বলতা, হঠাৎ করে তা নিভে গিয়ে চোখের নীলাভ মণিতে পুঞ্জীভূত হয় জরুরি কিছু হারিয়ে ফেলার বিষাদ। খুব মৃদুস্বরে সে কথা বলে, ‘আমরা কি কালরাতের বিষয়টি মিটিয়ে ফেলতে পারি না?’ একটু আগে নীলাভ প্রজাপতিদের উড্ডয়ন রেখা আমার চোখে ভাসে। ইসাবেলের চোখে জমা হচ্ছে দুফোঁটা অশ্রু। জলের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বৃত্তকে প্রজাপতির ডানার রুপালি গোলকের মতো দেখায়। প্রজাপতিরা বোধ করি এখন ভেসে গেছে অনেক দূর। লীলুয়া বাতাসে মেঘের মতো আমার মন থেকে ভেসে যায় গেলরাতের কালিমা লিপ্ত কষ্ট। আমি তার দিকে হাত বাড়িয়ে বলি, ‘লিসেন, কালরাতের বিষয়টা মিটেই গেছে, ডেখা অলভিডান দে এসতো, বা লেটস্ ফরগেট অ্যাবাউট দিস্।’ সে হাত ধরে আমাকে টানতে টানতে নিয়ে যায় গুহার ভেতর। আগ্নেয়শিলার আবডালে বসে সে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘আই হ্যাভ্ অ্যা সিক্রেট টু টেল ইউ। একবারই আমি ইন্ডিয়াতে যাই, খুব হ্যান্ডসাম গুজরাটি এক ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। হাইক করি আমরা একত্রে। পাহাড়ের ওপর বন বিভাগের পড়ো বাংলোতে আমরা লাঞ্চের জন্য ব্রেক নেই। ওখানে ওঁৎ পেতে ছিল তার আরও তিন-তিনটি বন্ধু। আমাকে তারা বারবার গ্যাঙ্গ-রেপ করে। আমি সুশ্রী নই বলে তারা আমার শরীরের প্রতি এত ব্রুটাল ছিল যে- ঊরুতে রক্তপাত নিয়ে আমি একা নেমে আসি পাহাড় থেকে। আমাকে দিন কয়েক থাকতে হয় হাসপাতালে।’ যারা ইসাবেলের সঙ্গে এ আচরণ করেছে, আমি তাদের হয়ে হাঁটু গেড়ে জোড়হাতে প্রার্থনা করি মা। সে আমাকে হাত ধরে টেনে তুলে বলে, ‘আই আন্ডারস্ট্যান্ড ইউ আর নট্ ওয়ান অব্ দেম্। বাট হোয়েনএভার আই সি সামওয়ান লাইক ইউ, আই ফিল লাইক অ্যা ভলকানো ইন মি, আই ফিল সো মাচ্ এঙ্গার’, বলে প্রসাধনের ছোট্ট গোল-আয়না দূরের ঝোপে ছুড়ে ফেলে সে ছাই-লিপ্ত বালুকায় গড়াগড়ি দেয়। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘ইটস্ অল বিহাইন্ড, আই ফিল কাইন্ড অব্ লাইট্ নাও। চল, এখানে আর দেরি নয়, লেটস্ স্টার্ট এগেইন।’ আমরা আবার হাইক করতে শুরু করি।
যে ক্রেইটার লক্ষ করে আমরা পথ চলছি সেখানে পৌঁছা সহজ হয় না। ঘণ্টা দেড়েক আমরা আগ্নেয়গিরির ঢালে হাইক করি। মাঝপথে থেমে থেমে ইসাবেল গুগল আর্থ থেকে নেওয়া মানচিত্রের প্রিন্টআউট পরীক্ষা করে। জিপিএস থেকে পাওয়া ইনফরমেশন খুব কাজে লাগে। তবে ঠিক বুঝতে পারি না আমরা এখন কোন পাহাড়ে আছি। ক্রমশ সবুজিমে ছাওয়া টিলাটক্কর দৃশ্যমান হতে থাকে। অবশেষে চক্রাকারে ঘূর্ণায়মান বেশ কটি চিলের ছায়ায় ওপর থেকে ঈষৎ হলুদাভ কালচে খয়েরি রঙের ক্রেইটারকে স্পষ্ট দেখতে পাই। দক্ষ নাবিকের মতো বাইনোকুলারে দ্রুত চারপাশ স্ক্যান করে ট্রেইলের রেখা খুঁজে বের করে, ইসাবেল অতঃপর আমাদের নামিয়ে নিয়ে আসে একদম হরলিক্সের বয়ামের মতো আকৃতির ক্রেইটারের গ্রীবায়।
বয়ামের মুখের ঠিক নিচে ক্রেইটারের ঢালু গলদেশে বসার জন্য খানিক ছায়া পাওয়া যায়। ম্যাথু তাতে ফোমের পাতলা শতরঞ্জি বিছিয়ে দিলে ক্লান্তিতে আমরা শুয়ে পড়ি। এক জোড়া চিলও আমাদের অনুসরণ করে উড়ে এসেছে এখানে। তারা উড়তে উড়তে নিচু হয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে আমাদের দিকে তাকায়। পাহাড়ের বর্ণ দেখে এ রকি ফের্মেশনকে ঠিক সেরো-নেগ্রোর ভলাকানো রেঞ্জের অন্তর্ভুক্ত মনে হয় না। এ ক্রেইটারের খুব কাছ থেকেই শুরু হয়েছে দিগন্তপ্লাবী সবুজের বিস্তার। এ দিকের পাথরচেরা ঝোপঝাড়ে ফুটে আছে ক্রিসেনথিমামের মতো দেখতে কিছু শুভ্র ফুল। বাতাসের ঝাপটায় ক্লান্তি মুছে যেতেই আমি খাবারের আয়োজন করি। এ যাত্রায় পানীয়জল ও শুষ্ক খাবার বহনের দায়িত্ব পড়েছে আমার ওপর। প্লাস্টিকের বাটিতে করে আমরা ভাজা রসুনের ফোড়ন দেওয়া পোড়া আলুর সঙ্গে সূর্যমুখী ফুলের বীজ ও কাকাওয়াতি বলে এক ধরনের চীনাবাদাম খাই। তারপর লেবু ও লবণ মিশ্রিত জল খেয়ে আবার শুয়ে পড়ি সটান।
ম্যাথু সূর্যজ্বলা সবুজ বিস্তারের দিকে তাকিয়ে, সফর উপযোগী করে তৈরি মিনিয়েচার গিটারে কান্ট্রি ওয়েস্টার্ন মিউজিকের সুর বাজাচ্ছে। তার বাদন ক্রমশ বিষণœ হতে হতে আগুন-পাহাড় ছুঁয়ে উড়ে যায় চিল-ভাসা প্রান্তরের দিকে। এ যাত্রায় মনের দিক থেকে আমি ম্যাথুর খুব কাছাকাছি এসেছি। গেলরাতে দ্বন্দ্বের পর ইসাবেল তাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় বাইরে। কোকেনাক্রান্ত দুজন ডিনার সেরে ফিরে আসে বেশ রাতে। আমার মেজাজ চটে যাওয়ায় রাতে একা আর কোনো রেস্তোরাঁয় খেতে যাইনি। ম্যাথু কিন্তু আমার জন্য নিয়ে আসে একটি স্যান্ডউইচ এবং তা নিয়ে আমার দরজায় নক করলে গভীর রাতে আমরা দুজন আবার কিছু সুখ-দুঃখের ব্যক্তিগত কথাবার্তায় মেতে উঠি। যে গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে তার দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক চলছিল তার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়েছে। একসময় ম্যাথু তেল কোম্পানির অ্যাকাউনট্যান্ট হিসেবে কাজ করত সৌদি আরবের রিয়াদে। তখন তার যুক্তরাষ্ট্রে বাসরত বান্ধবীর সঙ্গে সৃষ্টি হয় দূরত্ব। মেয়েটি ঘোরতর অসুস্থ হলে সে আমেরিকাতে ফিরে যায় তার দেখভাল করতে। মারাত্মক ক্যানসারে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার জননেন্দ্রিয়। সার্জারিতে সে অবশ্য সুস্থ হয়ে উঠেছে। তবে কী কারণে জানি সে আর ম্যাথুর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায় না। রিয়াদের কাজ শেষ করে ম্যাথু অধুনা ফিরে এসেছে আমেরিকাতে। দাম্পত্য জীবনের জন্য সে মানসিকভাবে প্রস্তুত। কিন্তু লিভ-টুগেদার বা বিয়ের পরিবর্তে ক্যানসার থেকে সদ্য সেরে ওঠা মেয়েটির এখন কাম্য একাকিত্ব। এ সম্পর্ক আর জোড়া লাগবে না। বিষয়টি ম্যাথু জানে। তারপরও বিচ্ছেদ তাকে পীড়া দিচ্ছে।
অনেকক্ষণ হয়ে গেল ক্রেইটারের ভেতরবাগে ক্লাইম্বিংয়ের দড়িদাড়া নিয়ে ইসাবেল নিখোঁজ হয়েছে। তাই আমি ও ম্যাথু তার তালাশে উঠে আসি ক্রেইটারের মুখে। একটি পাথরের সঙ্গে আটকানো দড়ো লোহার আঁকশি, তা থেকে দীর্ঘ দড়ি নেমে গেছে কালচে খয়েরি বাষ্পময় ক্রেইটারের গভীরে। দেখতে দেখতে অতিকায় গিরগিটির মতো চার হাতপায়ে ক্রল করে ওপরে উঠে আসে ইসাবেল। হাঁটু ও কনুইতে প্যাড বাঁধা সত্ত্বেও তার শরীরের নানা জায়গা ছিঁড়ে গিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। ঘণ্টা দুয়েক আগে সে ক্রোধ প্রশমন করতে গিয়ে অশ্বক্ষুরাকৃতির গুহার ছাই জমা ফ্লোরে গড়াগড়ি দেয়। এখন ক্রেইটারের ভেতরের বাষ্পে তা গলে গিয়ে তাকে দেখাচ্ছে মামদো ভূতের দৌহিত্রীর মতো। যেন এভারেস্ট জয় করেছে, এ রকম হিলারির কায়দায় দরাজ হেসে সে বলে, ‘লুক গাইজ্, ক্রেইটারের বেশ গভীরে আমি গ্লোয়িং মাগমা দেখেছি, অ্যান্ড গেস্ হোয়াট- বিশেষ ক্যামেরায় তার ছবিও তুলেছি।’ অন্ধকারে ঝলকানো মাগমা দেখা যে খুবই জরুরি তা আমি স্বীকার করলে- সে অর্জনের উদ্দীপনায় আমাকে জড়িয়ে ধরে। তার শরীর থেকে বাষ্পায়িত সালফারের জন্য বেরুচ্ছে নষ্ট ডিমের গন্ধ। এ সবকিছু অবজ্ঞা করে- বিষয়টিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ম্যাথু ঈষৎ ড্যান্স করে গিটারে একটি চটুল গানের সুর তোলে- ‘কিংস্ অব্ লেয়ন, কাম অ্যারাউন্ড সানডাউন।’ ভরদুপুরে সূর্যডোবা সানডাউনের গানকে ঠিক বেখাপ্পা শোনায় না।
