শেয়ারবাজারে নতুন হুজুগ 'মালিকানা বদল', খবর চাউর হলেই দাম বাড়ছে হু হু করে
নতুন হুজুগে মেতেছে শেয়ারবাজার। প্রায়ই শোনা যাচ্ছে, 'অমুক' কোম্পানির মালিকানায় আসছে 'তমুক' শিল্প গ্রুপ। এসব খবর প্রচার করে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো হচ্ছে।
কোম্পানি বদলের ক্ষেত্রে বেশি শোনা যাচ্ছে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক এস আলম গ্রুপ, ঢাকার সিটি, আলিফ ও ইউনাইটেড গ্রুপ এবং চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী শওকত আলী চৌধুরীর নাম। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য মালিকানা বদলও হচ্ছে।
মালিকানা বদলের খবর কিংবা গুজব এক কান থেকে দু'কান হওয়ার আগেই হুহু করে বাড়ছে সংশ্নিষ্ট কোম্পানির শেয়ারদর। এক মাস থেকে দেড় মাসে কোনো কোনো শেয়ারের দর দ্বিগুণ থেকে তিনগুণও হচ্ছে।
এ অবস্থায় অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী উদগ্রীব থাকেন কোন কোম্পানির মালিকানায় পরিবর্তন আসছে তা জানার জন্য। কারও কাছ থেকে এ ধরনের খবর বা গুজব পেলেই কোম্পানির ভালোমন্দ না দেখে কিনছেন শেয়ার।
এতে করে অনেকেই লোকসানেও পড়ছেন। বাজার-সংশ্নিষ্টরা জানান, কয়েক বছর আগে শেয়ারবাজারে কোম্পানি একীভূতকরণ বা অধিগ্রহণ নিয়ে আলোচনা বেশি হতো। এখন এর জায়গায় এসেছে মালিকানায় পরিবর্তন। কিছু ক্ষেত্রে মালিকানায় বদল হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূল্য কারসাজির উদ্দেশ্যেই গুজব ছড়ানো হচ্ছে।
সমকালের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত দুই থেকে তিন বছরে তালিকাভুক্ত প্রায় ৩০ কোম্পানির মালিকানায় রদবদলের ঘটনা ঘটেছে বা ঘটতে যাচ্ছে বলে খবর এসেছে; যা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ১০ শতাংশ।
এর মধ্যে গত এক বছরে পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন হয়েছে অন্তত আট কোম্পানির। কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক গ্রুপ বা তার কর্ণধাররা বড় অঙ্কের শেয়ার কিনছেন অন্তত ছয় কোম্পানির; যার সবক'টি বাণিজ্যিক ব্যাংক। এছাড়া আরও ১২ থেকে ১৩ কোম্পানিতেও একই ধরনের পরিবর্তন আসছে বলে জোর গুজব আছে। যার প্রভাবও রয়েছে শেয়ারগুলোর দরে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনালের ব্যবসায় অনুষদ বিভাগের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মূসা বলেন, দুর্বল মৌলভিত্তি বা বন্ধ কোম্পানির যে পর্ষদ তার কোম্পানিকে চালাতে বা মুনাফায় আনতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে পরিবর্তন হলে ভালো। তবে বাস্তবে তা হচ্ছে কি-না, তা দেখতে হবে।
পুরো ঘটনা না বুঝে কেবল মালিকানা পরিবর্তন হচ্ছে শুনে যে বিনিয়োগকারী অস্বাভাবিক বেশি দরে শেয়ার কিনছেন, তারা আগুনে তাদের কষ্টার্জিত টাকা ফেলছেন বলে মন্তব্য করেন শেয়াবাজারের এই বিশ্নেষক।
মার্চেন্ট ব্যাংক আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টের এমডি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান সমকালকে বলেন, কেউ অর্থাভাবে বা অন্য কারণে ব্যবসায় ভালো করতে না পারলে মালিকানায় পরিবর্তন হতেই পারে। এমন পরিবর্তন পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে অর্থাৎ স্বতঃস্ম্ফূর্ত হলে তা খুবই ভালো। কিন্তু জোর-জবরদস্তিমূলক হলে সে বিষয়ে সংশ্নিষ্ট সকলের সতর্ক থাকা উচিত।
অর্থনীতিবিদ ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ বলেন, বাজার থেকে শেয়ার কিনে যে কারও মালিকানায় আসতে বাধা নেই। তবে উল্লেখযোগ্য শেয়ার নিয়েও কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোম্পানির পর্ষদে বা ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ না নিলে তাকে মালিকানা বদল বলা যাবে না।
তিনি বলেন, আগে একীভূতকরণ বা অধিগ্রহণের নামে শেয়ার কারসাজি হতো। ওই প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইনি বাধা দেওয়ায় বাজার থেকে শেয়ার কিনে কোম্পানির দখল নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনগুলোর কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও আসছে না, যা আইনের ব্যত্যয়। কমিশনও বোধ হয় বিষয়টি ভালোভাবে নজরদারি করছে না।
যেসব কোম্পানিতে পরিবর্তন :যেসব কোম্পানির মালিকানায় ব্যাপক রদবদল হয়েছে ইসলামী ব্যাংক তার অন্যতম। ব্যাংকটি এখন আলোচিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমের নিয়ন্ত্রণে। সম্প্রতি সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকেও একই রকম পরিবর্তন এসেছে। এস আলম গ্রুপ এই ব্যাংকটিরও নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
গত বছরের শুরুতে গ্রুপটি শেয়ার কেনার আগে এর শেয়ারদর ছিল ২২ থেকে ২৩ টাকা। এরপর তা ৫০ টাকায় ওঠে। গত এক বছরে আরও ছয় কোম্পানির ক্ষেত্রে মালিকানায় বড় পরিবর্তন হয়েছে। এগুলো হলো- রহিমা ফুড করপোরেশন, ফু-ওয়াং সিরামিক, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ, ইস্টার্ন কেবলস ও আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ।
রহিমা ফুড করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত আবদুর রউফ চৌধুরীর উত্তরাধিকারদের কাছে থাকা কোম্পানিটির ৫৩ শতাংশ শেয়ার কিনে এর মালিকানায় এসেছে ব্যবসায়িক গ্রুপ সিটি। ২০১৫ সালের জুনেও শেয়ারটি ১৫ থেকে ২০ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে। সিটি গ্রুপ মালিকানায় আসছে-এ গুঞ্জনে শেয়ারটির দর নয়গুণ বেড়ে গত আগস্টে ১৯২ টাকায় ওঠে।
এ বছরের শুরুতে ফু-ওয়াং সিরামিকের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এসএস স্টিল নামের কোম্পানি। বস্ত্র তালিকাভুক্ত কোম্পানি জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনসের মালিক জাবেদ অপগেনহাপেন এসএস স্টিলেরও মালিক।
এ ঘটনার আগে গত ডিসেম্বরের শুরুতে ফু-ওয়াং সিরামিকের শেয়ার ১২ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে। জানুয়ারিতেই তা ১৮ টাকা এবং গত আগস্টে তা ২৭ টাকা ছাড়ায়। সম্প্রতি বন্ধ কোম্পানি সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজের পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইউরোদেশ গ্রুপের এক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।
নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও এক পরিচালকের কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইস্টার্ন কেবলসের ২০ শতাংশেরও বেশি শেয়ার কিনেছে বেসরকারি কোম্পানি বিআরবি। শোনা যাচ্ছে, বিআরবির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ইস্টার্ন কেবলসের পরিচালক হতে যাচ্ছেন।
এ খবরে শেয়ারটির দর ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে সরকার কখনই এ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণমূলক শেয়ার ছাড়বে না বলে জানা গেছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে ওষুধ খাতের সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ৩০ শতাংশ শেয়ার কিনতে সমঝোতা চুক্তি করে আলিফ গ্রুপ। কিন্তু নানা কারণে সম্প্রতি ওই চুক্তি থেকে সরে আসে কোম্পানিটি। কিন্তু এ খবরে শেয়ারটির দর ১৩ টাকা থেকে তিনগুণ বেড়ে প্রায় ৪০ টাকা হয়। এখন অন্য এক গ্রুপের কাছে কোম্পানিটি বিক্রি হচ্ছে বলে গুজব রয়েছে।
অবশ্য সেন্ট্রাল ফার্মার মালিকানায় না এলেও আলিফ গ্রুপ পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও তার পরিবারের সদস্যদের সব শেয়ার কিনে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সিএমসি কামাল টেক্সটাইলের। অবশ্য এ ঘটনা কয়েক বছর আগের। এছাড়া তালিকাচ্যুত কোম্পানি সজীব নিটওয়্যারেরও সিংহভাগ মালিকানা এ গ্রুপের হাতে।
নাম পরিবর্তন করে বর্তমানে এর শেয়ার ওটিসিতে আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ হিসেবে লেনদেন হচ্ছে। শিগগিরই এ কোম্পানি মূল শেয়ারবাজারে ফিরছে। আরও একাধিক রুগ্ণ ও বন্ধ কোম্পানির উদ্যোক্তারা তাদের শেয়ার বিক্রি করতে আলিফ গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
প্রক্রিয়াধীন :জানা গেছে, আরও অন্তত আট কোম্পানির শেয়ারের বড় অংশ হাতবদল হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে। অবশ্য এরই বেশিরভাগই ব্যাংক। এরমধ্যে সম্প্রতি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের বড় ধরনের শেয়ারহোল্ডিং পরিবর্তনের তথ্য মিলেছে। যার বড় অংশ যাচ্ছে নামে-বেনামে ইউনাইটেড গ্রুপ ও এস আলমের স্বার্থসংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে।
এছাড়া বেসরকারি খাতের প্রথম প্রজন্মের বড় ব্যাংক এবিরও মালিকানা পরিবর্তন হচ্ছে। এক্ষেত্রে ঢাকা, সাউথইস্ট ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়ারও নাম আছে।
এ ছাড়া বেসরকারি খাতের অন্যতম ব্যাংক দি সিটির শেয়ারদরও ব্যাপক হারে বাড়ছে এর শেয়ারের মালিকানার প্রশ্নে। বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফসি ব্যাংকটির মালিকানার ৫ শতাংশ নেওয়ার খবরে এর দর বছরের শুরুতে ২০ টাকা থেকে বেড়ে ৪০ টাকা ছাড়ায়।
এখন নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক এফএমও ৫ শতাংশের মালিকানা নেবে এমন খবরে শেয়ারটির দর ৫০ টাকা ছাড়িয়েছে।
আরও গুজব বা গুঞ্জন :বর্তমানে প্রকৌশল খাতের কোম্পানি বিডি ওয়েল্ডিংয়ের শেয়ারদর ব্যাপক হারে বাড়ছে। চট্টগ্রামভিত্তিক একটি বড় কোম্পানি এর মালিকানায় আসছে, বাজারে এমন গুঞ্জন রয়েছে। এ কারণেই শেয়ারটির দর বাড়ছে বলে জানা গেছে। গত মে মাসেও শেয়ারটির দর ছিল ১২ টাকা।
এখন ২৪ টাকা। এছাড়া লিগ্যাসি ফুটওয়্যারের মালিকানায় আসতে কুমিল্লা ইপিজেডের কোম্পানি রয়্যাল ডেনিম আলোচনা করছে বলে জানা গেছে। এ খবরে শেয়ারটির দর গত জুনের ২০ টাকা থেকে বেড়ে গত অক্টোবরেই ৬০ টাকা ছাড়ায়।
তালিকাভুক্ত এমারেল্ড অয়েলের শেয়ারের মালিকানার পরিবর্তনের খবরে শেয়ারটির দর মাঝে মধ্যেই বাড়ছে। অবশ্য বেসিক ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারিতে দুদকের মামলায় জড়িয়ে এর এমডি পলাতক হওয়ার পর কোম্পানিটি বন্ধ। বর্তমান পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা এর মালিকানায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন। তবে ফল এখনও শূন্য।
গত প্রায় দেড় বছর ধরে গুঞ্জন আছে এস আলম গ্রুপ বস্ত্র খাতের কোম্পানি সিএনএ টেক্সটাইলের উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার কিনে নিচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকের পাশাপাশি কয়েকটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানও এ গ্রুপটি কিনতে যাচ্ছে বলে শেয়ারবাজার পাড়ায় গুঞ্জন আছে।
শোনা যাচ্ছে, ফু-ওয়াং ফুডের মালিকানায়ও পরিবর্তন আসছে শিগগিরই। গত জুনে শেয়ারটির দর ছিল ১৫ টাকা। আগস্টেই তা ২৭ টাকায় ওঠে।
এছাড়া গুঞ্জন আছে বস্ত্র খাতের তুং-হাই নিটিং ও অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ কিনতে যাচ্ছে আলিফ গ্রুপ। এ ছাড়া বন্ধ কোম্পানি বিচ হ্যাচারি, বস্ত্র খাতের ফ্যামিলিটেক্স, ব্যাংক খাতের আইসিবি ইসলামিকের মালিকানায় বড় পরিবর্তনের গুজব আছে। তবে এর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

Join the conversation