01:53:56 am
Tuesday, August 25

ফেলানী হত্যার একযুগ: এখনও বিচার চেয়ে কাঁদেন মা

আজ ৭ জানুয়ারি। ২০১১ সালের এই দিনে কাঁটাতার পেরোতে গেলে ১১ বছর বয়সি ফেলানী খাতুনকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে ভারতীয় বিএসএফ। সীমান্তে সংঘটিত নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের পর ব্যাপক আলোড়ন ওঠে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মহলে। সমালোচনার ঝড় ওঠে দেশে-বিদেশে, লেখা হয় বেশ কিছু মর্মস্পর্শী কবিতা, গান। বহুল আলোচিত এই হত্যাকা-ের একযুগ পেরিয়ে গেলেও সন্তান হত্যার বিচার পায়নি তার পরিবার। বছর পেরিয়ে বছর আসে, বছর যায়; তবুও চোখ শুকায় না সন্তানহারা মায়ের। প্রিয় সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে এখনও কাঁদেন ফেলানীর মা।  জানা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনীটারী গ্রামের নূরুল ইসলাম পরিবার নিয়ে থাকতেন ভারতের বঙ্গাইগাঁও এলাকায়। সেখানেই একটি ইটভাঁটায় শ্রমিকের কাজ করতেন তিনি। এর মধ্যে বাংলাদেশে নিজের খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয় কিশোরী ফেলানী খাতুনের। সেই উদ্দেশ্যে বাবা নুরুল ইসলামের বড় মেয়ে ফেলানীকে নিয়ে ভারত থেকে রওনা দেন বাংলাদেশে। ২০১১ সালের আজকের এই দিনে কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল ৬টার দিকে দালালের মাধ্যমে ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে মই বেয়ে কাঁটাতার পার হচ্ছিলেন ফেলানী ও তার বাবা নুরুল ইসলাম। মইয়ের সামনে ছিলেন বাবা, তার পেছনে ফেলানী। এ সময় বিএসএফ টের পেয়ে গুলি ছুড়লে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ফেলানীর বাবা নেমে পড়তে পারলেও গুলিবিদ্ধ হয়ে কাঁটাতারেই ঝুলে পড়ে কিশোরী ফেলানীর দেহ। গুলিবিদ্ধ হয়ে ছটফট করে পানি পানি বলে চিৎকার করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ফেলানী। প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলে থাকে তার মৃতদেহ। 


এ ঘটনায় বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ভারত। সেই চাপের মুখে পড়ে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারের জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়। বিএসএফের এ আদালতে সাক্ষ্য দেন ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম ও মামা হানিফ। পরে ওই বছরেরই ৬ সেপ্টেম্বর আসামি অমিয় ঘোষকে খালাস দেয় বিএসএফের বিশেষ আদালত। রায় প্রত্যাখ্যান করে পুনঃবিচারের দাবি জানান ফেলানীর বাবা। ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আবারও বিএসএফের আদালতে পুনঃবিচার শুরু হয়। এবার শুধু সাক্ষ্য দেন ফেলানীর বাবা। আবারও ২০১৫ সালের ২ জুলাই ওই আদালত আত্মস্বীকৃত আসামি অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেয়। রায়ের পর একই বছর ১৪ জুলাই ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) ফেলানীর বাবার পক্ষে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন করে। ওই বছর ৬ অক্টোবর শুরু হয় রিট শুনানি। এরপর ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে কয়েক দফা শুনানি পিছিয়ে যায়। পরে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ করোনা শুরুর আগে শুনানির দিন ধার্য হলেও শুনানি আর হয়নি এ পর্যন্ত। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল ১২টি বছর। 


প্রতিবেশী মজিরন ও সামসুল বলেন, প্রথম প্রথম লোকজন এই পরিবারের খোঁজখবর নিলেও এখন আর রাখে না। বিচার শুরুর সময় মনে হয়েছিল ন্যায়বিচার পাবেন তারা। কিন্তু যেভাবে বিচার হচ্ছে এবং সময় কাটানো হচ্ছে তাতে বোঝা যায় ফেলানী হত্যার বিচার আর পাবে না তার পরিবার। 
ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম ও মা জাহানারা বেগম জানান, আমাদের সন্তানকে নির্মমভাবে কাঁটাতারে হত্যা করা হয়েছে। তাকে একটু পানিও খেতে দেওয়া হয়নি। এক যুগ পেরিয়ে গেলেও আমরা না পেলাম ক্ষতিপূরণ, না পেলাম ন্যায়বিচার।


পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এস. এম. আব্রাহাম লিংকন জানান, করোনার কারণে ফেলানী খাতুন হত্যার বিচার ঝুলে আছে। দুই রাষ্ট্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অটুট রেখে ভারতের উচ্চ আদালত বিচারটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে-এমনটাই প্রত্যাশা এই আইনজীবীর।

Share this post

Join the conversation