05:11:13 am
Friday, August 21
ডিএসই

চূড়ান্ত হচ্ছে চীন! ডিএসইর অংশীদার বাছাই জটিলতায় শেয়ারবাজারে দরপতন

কৌশলগত অংশীদার বাছাই প্রক্রিয়ার খবরের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে এবং শিগগিরই তা কাটিয়ে উঠবে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এরই মধ্যে গতকাল সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) পরিচালনা পর্ষদের নেতারা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে দেখা করে বাজার পরিস্থিতি জানিয়েছেন।

ডিএসই সূত্র নিশ্চিত করেছে, পুঁজিবাজার কিংবা বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কিছু করবে না কমিশন। চীনা কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য ভালো হওয়ায় ও আইনগত বিষয়াদিও তাদের পক্ষে থাকায় তারাই চূড়ান্তভাবে বাছাই হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সূত্র জানায়, কমিশন ডিএসইর প্রস্তাব পাওয়ার পর আইনগত বিষয়াদিসহ প্রস্তাবের আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করছে। কমিশন গঠিত কমিটিও এ নিয়ে কাজ করছে। সব কিছুর পরই চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে। দেশের স্বার্থ অগ্রাধিকার না পেলে কমিশন প্রস্তাব বাতিলও করতে পারবে।

এদিকে গতকাল সোমবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এ এম মাজেদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কৌশলগত অংশীদার বাছাইয়ে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। শেয়ারপ্রতি দাম ও কারিগরি সহায়তার আশ্বাস বিবেচনায় চীনা কনসোর্টিয়ামকে চূড়ান্ত করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

অন্য একটি কনসোর্টিয়াম আগ্রহ জানালেও পর্ষদের সিদ্ধান্তের পর ভালো প্রস্তাবদাতা হিসেবে চীনকে বাছাই করা হয়। এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা কমিটি গঠনের মাধ্যমে আইনগত বিষয় খতিয়ে দেখছে।

আশা করি সব কিছু বিবেচনা করেই সমাধান হবে। আমরা শেয়ার দামের চেয়ে কারিগরি সহায়তার দিকটিই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা এখানে অনড়। তবে জাতীয় স্বার্থের বিষয় আছে। সব দিক মিলেই যেটা ভালো হবে সেটিই করবে বলে আশা করছি।’

মাজেদুর রহমান আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে এডিআর কমানো ও কৌশলগত বিনিয়োগকারী নিয়ে আতঙ্ক থেকে বাজারে পতন হচ্ছে। এডিআর সমন্বয়ে সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। কৌশলগত অংশীদার ইস্যুটিও দ্রুতই সমাধান হবে। তবে সব কিছু মিলে প্রক্রিয়াকরণে এক বছরের মতো সময় লেগে যাবে।’

কৌশলগত অংশীদার নির্বাচন নিয়ে নানা গুজবের কারণেই পুঁজিবাজারে টানা দরপতন চলছে বলে মনে করেছেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি কালের কণ্ঠকে আরো বলেন, ‘চীনা প্রস্তাব সব দিক থেকে আকর্ষণীয় বলেই ডিএসই কর্তৃপক্ষ তাদের ব্যাপারে সুপারিশ করেছে।’

ভারতও কৌশলগত অংশীদার হওয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। দুই কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব দিক থেকেই এগিয়ে চীন। আর দেশের পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীর স্বার্থেই চীনকে বেছে নিয়েছে ডিএসই। কমিশন সব দিক বিবেচনায় অনুমোদন দিলেই চূড়ান্ত হবে।

জানা যায়, এ নিয়ে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের। ২০১৭ সালে সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের একটি কনসোর্টিয়াম পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জের ৪০ শতাংশ ইক্যুইটি শেয়ার কিনে বিনিয়োগ করে।

গত বছর মস্কো স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গেও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কৌশলগত সহযোগিতার চুক্তি করে। এমনকি সিল্করোড ইকোনমি বেল্ট উদ্যোগের আওতায় কাজাখস্তানের আস্তানা ইন্টারন্যাশনাল এক্সচেঞ্জের সঙ্গে গত বছর চুক্তি করে সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ।

চীনা প্রস্তাব অনুযায়ী, তারা দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করবে। ২২ টাকা দরে ৪৩ কোটি শেয়ার বাবদ অর্থ দাঁড়াবে ৯৯২ কোটি সাত লাখ টাকা। শেয়ার কেনার পাশাপাশি ৩৭ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ বা তিন কোটি ৭০ লাখ টাকার কারিগরি সহায়তায় ব্যয় করবে।

কারিগরি প্রযুক্তির জন্য ১০ বছরের লাইসেন্স ও নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত তিন বছরের ফ্রি ট্রেনিং ও কনসাল্টিং সার্ভিস দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। আর অংশীদার হওয়ার পরে পর্ষদে একজন পরিচালক রাখবে তারা। দেশের বাইরে বিনিয়োগে চীনা কনসোর্টিয়াম প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিয়েছে।

এদিকে ভারতের নেতৃত্বাধীন ত্রিদেশীয় কনসোর্টিয়াম ১৫ টাকা দর দিতে চায়। এ ক্ষেত্রে ৪৩ কোটি শেয়ারের মূল্য দাঁড়াবে ৬৭৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। পাঁচ বছরের মধ্যে শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যাবে তারা।

ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ নিজে সরাসরি শেয়ার কিনবে না, তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজিক ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন লিমিটেডের মাধ্যমে ২২.০১ শতাংশ শেয়ার কিনবে। কনসোর্টিয়ামের দুই অংশীদার ফ্রন্টিয়ার বাংলাদেশ কিনবে ৩ শতাংশ শেয়ার।

কনসোর্টিয়ামে নামডাক থাকলেও তারা কোনো শেয়ার কিনবে না; শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধা দেবে। ভারতের নেতৃত্বাধীন এই কনসোর্টিয়াম কারিগরি সহায়তা দেবে, তবে এতে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করবে সে বিষয়ে কিছুই বলেনি। তারা ডিএসইর পর্ষদে দুজন পরিচালক রাখার প্রস্তাব করেছে।

ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চীনা কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাবই বেশি আকর্ষণীয়। তারা এখানে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করবে। কারিগরি দিকেও সহায়তা আসবে। আর আমাদের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীও আসবে।’

তিনি বলেন, ‘চীনা দুই স্টক এক্সচেঞ্জের সুশিক্ষিত বিনিয়োগকারী আছে আমাদের, যেখানে ঘাটতি আছে। তবে তারা অংশীদার হলে তাদের নিজস্ব বিনিয়োগকারী দেশে আসবে। গতিশীল হবে পুঁজিবাজার। দেশের সার্বিক উন্নয়নেই ভূমিকা রাখবে পুঁজিবাজার।’ বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান বলেন, আইনগত দিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিলেই বিনিয়োগকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে।

ব্যবস্থাপনা থেকে মালিকানা পৃথককরণ বা ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন আইন অনুযায়ী কৌশলগত অংশীদারের কাছে ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করতে হচ্ছে। এ জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করে ডিএসই।

দরপত্রে সাড়া দিয়ে চীনের সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ ও শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জের যৌথ কনসোর্টিয়াম এবং ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ, ফ্রন্টিয়ার বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাকের কনসোর্টিয়াম অংশীদার হতে আগ্রহ প্রকাশ করে।

সম্প্রতি চীনা স্টক এক্সচেঞ্জ আসার খবরে দেশের পুঁজিবাজারে বড় উল্লম্ফন ঘটে। পরে এ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ার পর থেকে দর পড়তে থাকে, যা গতকালও অব্যাহত ছিল। কৌশলগত অংশীদার না পাওয়ায় ছয় মাস করে দুইবার সময় বাড়িয়েছে কমিশন, যা মার্চ মাসের ৮ তারিখ শেষ হচ্ছে।

Share this post

Join the conversation