চাষির মুখে গোলাপ ফুলের হাসি
গোলাপ রাজ্যের কৃষকদের দুর্দিন কাটতে শুরু করেছে। সাভারে গত কয়েক বছর পর এবার ফলন হয়েছে ভালো। হাসি ফুটতে শুরু করেছে চাষিদের মুখে।
গোলাপ রাজ্যের কৃষকদের দুর্দিন কাটতে শুরু করেছে। সাভারে গত কয়েক বছর পর এবার ফলন হয়েছে ভালো। হাসি ফুটতে শুরু করেছে চাষিদের মুখে।
মঙ্গলবার সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের শ্যামপুর, মৈস্তাপাড়া, সাদুল্লাপুর, বাগ্নীবাড়ি ও ভবানীপুরে সরেজমিন দেখা যায়, বিরুলিয়া যেন রূপান্তর হয়েছে গোলাপ উদ্যানে। মাঠের পর মাঠজুড়ে লাল, সাদা, হলুদ রঙের গোলাপের সমারোহ। শুধু মাঠ নয়, বসতবাড়ির আঙিনাতেও ফুটে আছে গোলাপ। গোলাপ চাষিদের কেউ ব্যস্ত আছেন গোলাপ তুলতে, কেউ বাগান থেকে তোলা গোলাপ তরতাজা রাখতে পানিতে রাখছেন, কেউ গোলাপ বাজারে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ আবার ঝাঁকা বোঝাই করে গোলাপ নিয়ে ছুটছেন স্থানীয় ফুলের বাজারে। এ যেন এক গোলাপের রাজ্য।
গোলাপ চাষিরা জানান, ডিসেম্বরের শুরু থেকে মার্চ মাসের পুরোটাই গোলাপের মৌসুম। এ সময় বাগানগুলো ফুলে ফুলে পূর্ণ থাকে। ১ জানুয়ারি, ফাল্গুনের প্রথম দিন বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি ও স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চে ফুল বিক্রির ধুম পড়ে।
একটি বাগানের পরিচর্যাকারী আলহাজ বলেন, আমি বিগত ১০ বছর ধরে গোলাপের বাগানে কাজ করি। গোলাপ গ্রামে গত কয়েক বছর কৃষকের মুখে হাসি ছিল না। করোনা ও বাগানে ছত্রাকের সংক্রমণ সেই হাসি কেড়ে নিয়েছিল। তবে এ বছর ফলন ভালো পেলেও শুরুতে গোলাপের দাম পড়ে গিয়েছিল। এখন আবার দাম বাড়তে শুরু করেছে। এভাবে দাম থাকলে এ বছর লাভের আশা করা যাবে।
গোলাপ চাষি রমজান বলেন, বাজারে সার থেকে বীজ সবকিছুরই দাম বেশি। বাগানে যে টাকা লগ্নি করেছি তা তুলতেই কষ্ট হয়ে যায়। সামনে ফুলের বাজার কমলে আবারও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।
বাজারমূল্য নিয়ে তিনি বলেন, ডিসেম্বরের শুরুতে প্রতিটি গোলাপ বিক্রি হতো ৬ থেকে ৭ টাকায়। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৮ থেকে ১০ টাকা। সামনে আরও ২-১ টাকা বাড়তে পারে বলে আশা করি।
মিরপুর থেকে বিরলিয়া এসে গোলাপ চাষ করেন মো. সাবেদ আলী। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, অনেক বছর আগের কথা আমি যখন এই এলাকায় জমি পত্তন নিয়ে গোলাপের চাষ শুরু করি তখন কেউ এই এলাকায় গোলাপের চাষ করত না। আমি চাষ করতাম। তার পাশাপাশি গ্রামের সবাইকে বলতাম গোলাপের চাষ করতে। আর এখন এ অঞ্চলের চাষিদের প্রধান চাষ হচ্ছে গোলাপ। এ অঞ্চলের অধিকাংশ পরিবারের জীবিকার উৎস হচ্ছে গোলাপ। করোনায় ফুল বিক্রি অনেক কমে গিয়েছিল। ফলে আমাদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২১ সালের ডিসেম্বরের মাঝের দিকে ছত্রাকের আক্রমণে গোলাপের বাগানগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এতে পুরো মৌসুম লোকসান গুনতে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের নানা প্রান্তে গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, কসমস, ডালিয়া, জারবেরা, রজনীগন্ধা, জিপসি ও গ্লাডিওলাস উৎপাদন হলেও এসব ফুলের পাশাপাশি দেশের গোলাপ ব্যবসার প্রায় অর্ধেকটাই জোগান দেয় সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের গোলাপ গ্রাম।
ফুল দোকানদার মিল্টন বলেন, আমি স্কুলে লেখাপড়া করি, পাশাপাশি এই অস্থায়ী দোকানে ফুলের দোকানে ব্যবসা করি। গোলাপের গ্রামে অনেক দর্শনার্থী ঘুরতে আসেন। সেই দর্শনার্থীদের কাছে গোলাপ ফুল বিক্রি করে থাকি। যে অর্থ উপার্জন করি তা দিয়ে আমার নিজের লেখাপড়ার জন্য খরচ করি, বাকি অর্থ মায়ের হাতে তুলে দিই। আমাদের পরিবার ভালো আছে।
পরিবারের তিন সদস্যকে নিয়ে গোলাপ বাগানে বেড়াতে এসেছিলেন মামুন মোল্লা। ঘুরে দেখতে দেখতে একসময় নেমে যান ফুল তুলতে। নিজের হাতে বাগান থেকে ফুল তুলতে পেরে উচ্ছ্বসিত মামুন মোল্লা বলেন, ঢাকার কাছেই এমন ফুলের বাগানের কথা শুনে দেখতে এসেছিলাম। সত্যিই অসাধারণ!
এখন গোলাপ বাগানের নিত্যচিত্র হচ্ছে-লাল টকটকে গোলাপ উদ্যানে দুপুরের পর থেকেই চাষিরা গোলাপ তুলতে শুরু করেন। মাঠের পর মাঠজুড়ে সে দৃশ্য দেখে যে কারও মন জুড়িয়ে যায়।
সাভার উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এলাকার প্রায় দেড় হাজার কৃষক বাণিজ্যিকভাবে গোলাপ চাষে জড়িত। এখানকার প্রায় ২৭৫ হেক্টর জমিতে গোলাপের চাষ হয়।
সাভার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজিয়াত আহমেদ বলেন, করোনার কারণে ফুল বিক্রি না হওয়ায় কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ছত্রাকের আক্রমণে গোলাপ বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষকরা আবারও লোকসানে পড়েন। তবে এবার আশার খবর হচ্ছে, চাষিরা গোলাপের ভালো ফলন পাচ্ছেন এবং বাজারে দামও পাচ্ছেন ভালো। দীর্ঘদিন পর গোলাপ চাষিদের মুখে হাসি ফিরেছে।
