08:35:27 am
Tuesday, August 25

ক্ষমতাসীনদের ‘সাত্তার কৌশল’

বিএনপির সিদ্ধান্ত মেনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য পদত্যাগ করেও এ আসনে উপনির্বাচনে ভোটের মাঠ ছাড়েননি উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া। সংসদ সদস্য পদ ছেড়ে দিয়ে দলের সমালোচনা করে বহিষ্কৃত হয়ে তিনি লড়ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। তবে তার পক্ষে কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মী। এতে ‘সাপে বর’ হয়েছে উকিল সাত্তারের। 

গত শনিবার গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদ, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ এবং উপদেষ্টা পরিষদের যৌথসভার মুলতবি বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের নেতাকর্মীদের উকিল আবদুস সাত্তারের পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দেন। এটি বিএনপির জন্য ‘উকিল সাত্তার কৌশল’ বলে গুঞ্জন উঠেছে রাজনৈতিক মহলে। এ কৌশলে আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে সাত্তারের মতো বিএনপির আরও কিছু নেতাকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে উপনির্বাচনে আবদুস সাত্তারের প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রেও উদ্বেগ স্পষ্ট। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হলে ২০১৪ সালের মতোই আন্দোলনে গিয়ে ভোট বর্জনের ঘোষণা আছে দলটির। আগের দুটি জাতীয় নির্বাচনের একই দাবি ছিল। দুবারই আলোচনার জন্য দলটিকে ডাকলেও এবার তাদের পাত্তাই দিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। বরং ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বক্তব্য এসেছে, বিএনপি ভোটে না এলে দলের অনেকেই স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করবে। এমনকি বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্যও এ ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে সতর্ক করেছেন দলকে। গত ছয়টি নির্বাচনে যারা সাত্তারের হয়ে কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ ক্ষুব্ধ হলেও অনেকেই রয়েছেন পাশে। এতে রাজনৈতিক মহলে উকিল আবদুস সাত্তারকেন্দ্রিক আলোচনা আরও তুঙ্গে উঠেছে। আলোচনা চলছে আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও দলটির অনেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লড়বেন। ফলে নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সরকারকে কোনো বেগ পেতে হবে না। আর এ অবস্থায় বিএনপি নির্বাচনে না এলে তা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

গণভবনে আওয়ামী লীগের বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল ও আশুগঞ্জ) আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুস সাত্তার ভূঁইয়ার পক্ষে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কাজ করার নির্দেশনা দেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, দলীয় নেতাকর্মীরা আবদুস সাত্তার ভূঁইয়ার পক্ষে কাজ করবেন। কারণ তিনি সংসদে গিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলবেন। তাই তাকে যেভাবেই হোক জেতাতে হবে।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা মনে করেন, বিএনপি পানি খায় ঘোলা করে। গত ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল করেছে। এরপর গত ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়। এতে তারা ছয়টি আসনে জয়ী হয়। পরে ছয়টি আসন থেকেই পদত্যাগ করে। এর মধ্যে একটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২। এ আসনেরই সংসদ সদস্য ছিলেন উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া। আবার এ আসনের উপনির্বাচনেই প্রার্থী হয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক মেরুকরণে তার জয়ের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়, বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনেক নেতাই মানেন না। বিদ্রোহী সেই নেতাদের দলে টানার কৌশল প্রয়োগ করছে আওয়ামী লীগ। এটা বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল।

উকিল সাত্তার ইস্যুতে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপি ঘুঘু দেখেছে, ফাঁদ দেখেনি। আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কারণেই তাদের আজকে এ পরিণতি। আগামীতেও যদি এমন সিদ্ধান্ত নেয়, সে ক্ষেত্রে উকিল আবদুস সাত্তারের মতো অনেকেই মাথা চাড়া দেবেন। বিএনপি বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে না। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যু আদালতের রায়ে মীমাংসা হয়ে গেছে, সেটার দাবিতে বিএনপি এখন অনড়। তাদের এ সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী। এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে না এলে ভবিষ্যতে বিএনপি ছেড়ে আগামী নির্বাচনে অনেকেই অংশ নেবে। যেটি উকিল আবদুস সাত্তারকে দিয়ে শুরু হলো।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন এ প্রসঙ্গে সময়ের আলোকে বলেন, সংসদ সদস্য পদ ছেড়ে দিয়ে উকিল আবদুস সাত্তার আবার একই আসনের উপনির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এরপরও যদি বিএনপি না শোধরায় তাহলে আরও অনেক উকিল সাত্তারের আবির্ভাব হতে পারে।

আর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল বলেন, যারা রাজনীতি করেন, তারা জনগণের জন্য রাজনীতি করেন। উকিল সাত্তার একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ। কিন্তু বিএনপি একটি জনবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দল। তাই জনগণের জন্য তারা কিছুই করতে পারে না। তারা হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যেতে চায়। এ জন্য বিএনপির মধ্যে যেসব মুক্তমনা রাজনীতিবিদ রয়েছেন, তারা নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। তাদের উপেক্ষা করার ফলস্বরূপ ওই নেতারা বিএনপিকেই একসময় ত্যাগ করবেন, এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি। এর প্রকৃত উদাহরণ উকিল আবদুস সাত্তার। তিনি বিএনপির জন্য সিগন্যাল।

এদিকে গত শনিবার দুপুরে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে আওয়ামী লীগের তিন স্বতন্ত্র প্রার্থী নিজেদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। তারা হলেন- ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল বারী চৌধুরী, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঈন উদ্দিন ও স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলম। আওয়ামী লীগের তিন হেভিওয়েট প্রার্থীর সরে দাঁড়ানোয় কপাল খুলছে উকিল সাত্তারের। যদিও এখনও পাঁচ প্রার্থী রয়েছেন ভোটের মাঠে। তবে ওইসব প্রার্থীর চেয়ে সাত্তার এগিয়ে রয়েছেন বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা। ফলে নিজের ছেড়ে দেওয়া আসনে আবারও এমপি হতে যাচ্ছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত এই বর্ষীয়ান রাজনীতিক।

অন্যদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন উকিল আবদুস সাত্তার। একবার স্বতন্ত্রসহ তিনি ওই আসনের পাঁচবারের সংসদ সদস্য। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে তিনি পরাজিত হন। ছয়বার নির্বাচন করে তিনি মাত্র একবার পরাজিত হন। তার এমন সিদ্ধান্তে বিএনপির নেতাকর্মীরাও বিস্মিত, কেউ কেউ ক্ষুব্ধ। তারা এ পদক্ষেপকে দেখছেন দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ উপনির্বাচনে ২০১৮ সালের মতোই টান টান উত্তেজনা। সেবার আওয়ামী লীগ এ আসনে প্রার্থী দেয়নি। সাত্তার ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে জাতীয় পার্টির নেতা রেজাউল ইসলাম ভূঞা ছিলেন মহাজোটের প্রার্থী।

গত ১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে দলটির সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সভায় জানানো হয়, বিএনপির এমপিদের পদত্যাগে শূন্য হওয়া ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৪ দলীয় শরিকদের দুটি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানান, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে ১৪ দলীয় জোটের ওয়ার্কার্স পার্টি, বগুড়া-৪ আসনে ১৪ দলীয় জোটের শরিক জাসদকে (ইনু) ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তারা সেখানে প্রার্থী মনোনয়ন দেবে।

ওবায়দুল কাদের বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনেও আমরা কোনো প্রার্থী দিচ্ছি না। এ আসনটি উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। বগুড়া-৬ আসনে রাগেবুল আহসান রিপু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে মো. জিয়াউর রহমান এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে আবদুল ওয়াদুদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে প্রথম তৎকালীন কুমিল্লা-১ (নাসিরনগর ও সরাইলের একাংশ) ও বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া। ওই সময়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি ছিলেন। দল থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি। এরপর ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের দুটি সংসদ নির্বাচনে বিএনপির দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ইসলামী ঐক্যজোটের তৎকালীন মহাসচিব মুফতি ফজলুল হক আমিনীকে আসনটি ছেড়ে দেন আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া। ওই সময়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন করলে তাকে টেকনোক্র্যাট প্রতিমন্ত্রী করা হয়।

Share this post

Join the conversation