৫ বছরে ২৭১০ শিশু হত্যা
আলিনা ইসলাম আয়াত (৫)। গত ১৫ নভেম্বর শিশুটি নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের ১০ দিন পর আয়াতের খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মুক্তিপণের দাবিতে আয়াতকে হত্যা করে তারই প্রতিবেশী আবির আলী নামের এক যুবক। আবির আলীর সঙ্গে শিশু আয়াতের না ছিল কোনো দ্বন্দ্ব, না ছিল তার পরিবারের সঙ্গে পূর্বশত্রুতা। কেবল কিছু টাকার জন্য শিশুটিকে অপহরণ করে আবির। আর
আলিনা ইসলাম আয়াত (৫)। গত ১৫ নভেম্বর শিশুটি নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের ১০ দিন পর আয়াতের খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মুক্তিপণের দাবিতে আয়াতকে হত্যা করে তারই প্রতিবেশী আবির আলী নামের এক যুবক। আবির আলীর সঙ্গে শিশু আয়াতের না ছিল কোনো দ্বন্দ্ব, না ছিল তার পরিবারের সঙ্গে পূর্বশত্রুতা। কেবল কিছু টাকার জন্য শিশুটিকে অপহরণ করে আবির। আর সামান্য সেই টাকা না পেয়েই শিশুটিকে হত্যার পর লাশ ৬ টুকরো করে ঘাতক আবির।
এভাবেই কোমলমতি শিশুদের টার্গেট করে অপরাধপ্রবণতা বেড়েই চলছে। বড়রা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য নিষ্পাপ শিশুদের ঠেলে দিচ্ছেন বিপদের মুখে। অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছে। অনেক সময় মুক্তিপণ না পেলে এসব শিশু হত্যার শিকার হয়। শুধু হত্যা নয় নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনাও অহরহ। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবা নিজেই হিংস্র আচরণ করে শিশু হত্যা করছেন। এভাবে বড়দের লোভ-দ্বন্দ্ব, স্বার্থ ও জেদের কারণে জন্মের পরপরই অনেক শিশুর জীবনের গতি থেমে যাচ্ছে। অঙ্কুরেই নিভে যাচ্ছে তাদের জীবনপ্রদীপ। শেষ হচ্ছে একটি স্বপ্নের।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২২ সালে ৫১৬ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। শূন্য থেকে ৬ বছরের শিশু ১৩০ জন, ৭ থেকে ১২ বছরের শিশু ৯১ জন ও ১৩ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত ২৩৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৭ জনকে। শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে ১৪৪ জনকে। পরিবার থেকে নির্যাতিত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১১৯ জনেন। আত্মহত্যা করেছে ৩৮ জন। শিক্ষক দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের। শিশুর হত্যার পর মরদেহ পাওয়া গেছে ১০৯ জনের। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ২১৯টি। এভাবেই প্রতি বছরই শিশু হত্যা হচ্ছে। ২০২১ সালে ৫৯৬ জন, ২০২০ সালে ৫৮৯ জন, ২০১৯ সালে ৪৮৮ জন ও ২০১৮ সালে ৫২১ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।
এই মানবাধিকার সংগঠনটি জানায়, এসব শিশুর মধ্যে কাউকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, কাউকে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে, কাউকে শারীরিক নির্যাতনের পর, কাউকে অপহরণের পর মুক্তিপণ না পেয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিখোঁজের পর লাশ উদ্ধারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকতা, নৈতিক অবক্ষয়, পরকীয়া, সাইবার দুনিয়ার প্রতি নিয়ন্ত্রণহীন আসক্তি ও পারিবারিক বিশৃঙ্খল জীবনে শিশুরা বেশি ক্ষতির শিকার। এ ছাড়াও সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা পরিবারে শিশুদের ওপর প্রভাব ফেলছে। কোনো শিশুর জীবন বিপন্ন হলে তার ভাইবোনসহ কাছের শিশুদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিপথে চলে যাওয়া শিশুদের মা-বাবাকে সমাজ ভালোভাবে নেয় না। বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে সমাজে তা গ্রহণযোগ্যতা পায় না। এমন বাস্তবতায় অনেকেই নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। যার প্রভাব পড়ে শিশু সন্তানদের ওপর। আবার অন্যদের ফাঁসাতে গিয়েও নিজ সন্তানকে হত্যার ঘটনাও ঘটছে।
এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এ কে এম হাফিজ আক্তার সময়ের আলোকে বলেন, অপরাধীরা সব সময় দুর্বলকে টার্গেট করে কাজ করে। শিশুরা দুর্বল হওয়ায় লোভ ও স্বার্থের জন্য তাদের হত্যা করা হয়। আগে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ ও প্রতিশোধ নিতে শিশুদের খুন করা হতো। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও ছিল। কয়েক বছর ধরে পারিবারিক কলহের জেরে স্বামী-স্ত্রীর হাতে সন্তানদের খুনের ঘটনা বাড়ছে। পারিবারিক অস্থিরতা ও অসততার কারণে শিশু খুনের ঘটনা বাড়ছে। তবে এসব ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে তদন্তও করা হচ্ছে। গ্রেফতার হচ্ছে অপরাধীরা।
ঢাকা মাহনগর পুলিশের (ডিএমপি) অপরাধ চিত্রে দেখা গেছে, ২০২২ সালে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৪০৫টি। এ ছাড়াও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ২০২১ সালে ৪২০টি, ২০২০ সালে ৪২৬টি ও ২০১৯ সালে ৩৮৮টি মামলা হয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক পরিসংখ্যায় দেখা গেছে, ২০২২ সালে শিশু ও নারী নির্যাতন হয়েছে ৩ হাজার ৪৯৫ জন। ২০২১ সালে ৩ হাজার ৭০৩ জন ও ২০২০ সালে ৩ হাজার ৪৪০ জন শিশু ও নারী নির্যাতন হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনরা যা বলছে : আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নূর খান সময়ের আলোকে বলেন, দেশে একধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অস্থিরতাসহ সমাজের অবক্ষয় বিরাজ করছে। যার ফলে এ ধরনের শিশু হত্যা, নারী নির্যাতন, নিপীড়ন ক্রমাগত বাড়ছে। এ ছাড়াও বিচারহীনতা ও সংস্কৃতির কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। তবে এর থেকে বের হওয়ার উপায় একটাই- নৈতিকতার চর্চা করতে হবে। নীতিহীন রাজনীতির জায়গায় নৈতিকতাকে স্থাপন করতে হবে। জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ফিরিয়ে আনতে হবে। এ ছাড়া সুষ্ঠু বিচার যদি হয়, একজন ভিকটিম যদি বিচার পায় তাহলেই এ ধরনের অপরাধ কমে আসবে।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের সাবেক পরিচালক আবদুল শহিদ মাহমুদ সময়ের আলোকে বলেন, এই শিশু হত্যা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন শিশু আইনের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। শিশু হত্যার মামলা দ্রুত তদন্ত শেষ করে নিষ্পত্তি করা।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু সময়ের আলোকে বলেন, হত্যা হওয়া অর্ধেক শিশুই ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিশুরা সবসময় একটি ঝুঁকির মুখে থাকে। শিশুদের নিয়ে চাইল্ড রাইট কনভেনশন কাজ করছে ঠিকই, কিন্তু শিশু সুরক্ষার ব্যাপারে যথেষ্ট মনোযোগী নয় তারা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, শিশুদের প্রতি প্রতিহিংসার জন্য আকাশ সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার অনেকাংশে দায়ী। এ ছাড়া সমাজ ও পরিবারের মধ্যে স্বার্থপরতা বাড়ছে। অনৈতিক ও আপত্তিকর কর্মকাণ্ডে মানুষ জড়িয়ে পড়ছে। এসবের কারণে শিশুরা অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের নৈতিকতার জায়গাও দুর্বল হয়েছে। পরিবারে একে অন্যের প্রতি ভালোবাসার বন্ধন নড়বড়ে। দায়িত্ববান হওয়ার চেয়ে দায়িত্বহীন হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে মা-বাবা ক্ষেত্র বিশেষ হিংস্র হয়ে যাচ্ছে। স্বার্থ হাসিল ও অন্যকে ফাঁসাতে গিয়ে নিজের সন্তানকে খুন করতে দ্বিধাবোধ করছে না। অনেক সময় মা তার সন্তানদের নিজের হাতে খুন করে নিজেও আত্মঘাতী হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শিশুদের সুরক্ষায় যে আইন আছে তার প্রয়োগও কম।
নৃশংস কিছু ঘটনা : গত ১৫ জানুয়ারি বগুড়ার শিবগঞ্জের আবু হুরায়রা (১১) শ্বাসরোধে হত্যা করে তার বাইসাকেল নিয়ে যায় দুই কিশোর। সাইকেলটি বিক্রি করে স্মার্টফোন কিনতে চেয়েছিল তারা। সামান্য কিছু টাকার জন্য হত্যা করা হয়েছে ওই শিশুকে। ওই ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। জানা যায়, আটক কিশোররা মুঠোফোনে গেমসের নেশায় আসক্ত ছিল। গত ৫ জানুয়ারি পিরোজপুরের নাজিরপুর এলাকায় সামান্য কথা না শোনাকে কেন্দ্র করে ৮ বছরের শিশু আরিফা আক্তারকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন সৎমা। ওই ঘটনায় সৎমা আয়শা আক্তারকে (২৫) গ্রেফতার করে পুলিশ।
গত ২৬ ডিসেম্বর নরসিংদীর বেলাব উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদের তীরে ঝোপের ভেতর থেকে চার বছরের মেয়ে শিশুর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। চোখ উপড়ানো ও বিবস্ত্র অবস্থায় পাওয়া যায় লাশটি। পুলিশ বলছে, শারীরিক নির্যাতনের পর শিশুটিকে হত্যা করে লাশ ঝোপের মধ্যে ফেলে গেছে।
গত ৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাজধানীর হাজারীবাগ গদিঘর এলাকার একটি বাসা থেকে মাসহ দুই শিশু সন্তানের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তারা হলেন- হাসিনা বেগম (২৫), তার দুই শিশু সন্তান সাদিয়া (৩) ও সিয়াম (৭ মাস)। দুই সন্তানকে হত্যার পর মা আত্মহত্যা করেছে বলে তথ্য পায় পুলিশ। নিহত হাসিনা বেগমের স্বামী সাদ্দাম হোসেন বলেন, তিনি প্রাইভেটকার চালক। ঘটনার দিন বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে বাচ্চাদের ঠান্ডা লাগা নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। সন্ধ্যার পর পরিবারে বিপদের খবর পেয়ে বাসায় যান।
গত ২ ডিসেম্বর দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় ৮ বছর বয়সি শিশু আরিফুজ্জামানকে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে নিয়ে যায় প্রতিবেশী যুবক শরিফুল ইসলাম। এরপর পুরো বিকাল চলে সাইকেল নিয়ে ঘোরাঘুরি। সন্ধ্যার দিকে ওই শিশুকে নিজের বাড়িতে নিয়ে কৌশলে আটকে রাখে শরিফুল। রাতে ওই শিশুর বাবাকে কল করে শরিফুল ১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। মুক্তিপণ না পেয়ে রাতেই শিশুকে নির্যাতনের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ বস্তাবন্দি অবস্থায় বাড়ির আঙিনায় পুঁতে রাখে শরিফুল। পরে ৪ ডিসেম্বর পুলিশ শিশুটির মরদেহ উদ্ধার এবং শরিফুলকে গ্রেফতার করে।
