06:13:04 pm
Tuesday, August 25

নির্বাচন পর্যন্ত ‘ঘরে’ থাকবে হেফাজত

এক সময়ের তেজী হেফাজত মামলা-হামলার চাপে ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। সরকারের সঙ্গে সমঝোতা-দেনদরবার করে চলার চেষ্টা করছে বর্তমান হেফাজত। নির্বাচন পর্যন্ত সরকারও ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে তাদের।

২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ আলোচনায় চলে আসে। এরপর বিভিন্ন সংকটে পর্যুদস্তু হয়ে পড়ে কওমি মাদরাসাভিত্তিক এই সংগঠন। সবশেষ ২৬ মার্চ নরেন্দ্র মোদিবিরোধী আন্দোলনে সরকারের সঙ্গে পেরে উঠতে না পেরে আরেক দফা ব্যাকফুটে চলে যায় হেফাজত। এই ঘটনার মামলায় সংগঠনের প্রভাবশালী মামুনুল হকসহ কয়েক ডজন নেতা গ্রেফতার হন। তাদের মুক্তির দাবিতে মাঠে আন্দোলন কিংবা প্রতিবাদ না করে হেফাজত সরকারের অনুকম্পা চেয়েই যাচ্ছে। এ নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হলেও সংগঠনের শীর্ষ নেতারা বলছেন, তারা সঠিক পথেই আছেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মীর মোহাম্মদ ইদ্রিস জানান, তাদের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে ২৮৫টি মামলা বিচার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আশ্বাস দিলেও ২০১৩ সালের একটি মামলাও প্রত্যাহার করা হয়নি। এ ছাড়া এখনও সাতজন আলোচিত আলেমসহ দুই ডজনের মতো নেতাকর্মী কারাবন্দি। তিনি জানান, শক্তিশালী সংগঠকের মধ্যে আছেন বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক, নাসির উদ্দিন মুনির, সহকারী মহাসচিব শাখাওয়াত হোসাইন রাজী, অর্থ সম্পাদক মুনির হুসাইন কাসেমী, শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মুফতি হারুন ইৎহার, কেন্দ্রীয় নেতা নাছির উদ্দিন মনির, নূর হোসাইন নূরানী, আজহারুল ইসলাম প্রমুখ। এ ছাড়া হেফাজত সমর্থক বিতর্কিত বক্তা মাহমুদুল হাসান গুনবী ও রফিকুল ইসলাম মাদানী এখনও কারাগারে আছেন।

হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মুহিউদ্দীন রাব্বানী সময়ের আলোকে জানিয়েছেন, তারা সরকারপ্রধানসহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার দেখা করে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার এবং কারাবন্দি নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। সর্বশেষ গত ১৭ ডিসেম্বর গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এবং চলতি মাসের ১৬ জানুয়ারি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে বৈঠকেও এ দাবি জানিয়েছেন। সরকারের সঙ্গে আবারও বৈঠক করবেন তারা।

সূত্র জানায়, নেতাকর্মীদের মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার এবং শিক্ষা কমিশনে আলেমদের অন্তর্ভুক্ত করাসহ প্রধানমন্ত্রীর কাছে হেফাজতে ইসলাম সাতটি লিখিত দাবি জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া আমির ও মহাসচিবের লেখা চিঠির শুরুতেই তারা জানান, ভবিষ্যতে হেফাজত কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হবে না। তারা বরাবরই অরাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। যদিও হেফাজতের শীর্ষ তিন-চারজন শীর্ষ নেতা ছাড়া বর্তমান কমিটির বেশিরভাগ নেতা কোনো না-কোনো রাজনৈতিক দলে জড়িত। 

সাংগঠনিক সম্পাদক মীর মোহাম্মদ ইদ্রিস জানান, তিনি নিজে খেলাফত আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব। একাদশ নির্বাচনে প্রার্থীও হয়েছিলেন। তার দলের আমির আতাউল্লাহ হাফেজ্জীও হেফাজতের সিনিয়র নায়েবে আমির।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে সময়ের আলোকে বলেন, সরকার বললেও আমরা ঘরে থাকব না। তবে মাঠে তো অনেক আন্দোলন করেছি। জুলুমের শিকার হয়েছি। কিন্তু ফলাফল শূন্য। ১৩ দফার একটিও মানা হয়নি। তাই এখন মাঠের বাইরে ভিন্ন কৌশলে এগোনোর চিন্তা করছে হেফাজত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হেফাজতের একজন সিনিয়র নেতা জানান, সরকারের শীর্ষ মহল থেকে তাদেরকে ঘরে ধর্মীয় কাজে নিয়োজিত থাকার পরামর্শ দিয়েছে। রাজনীতি নিয়ে চিন্তা না করার কথা বলা হয়েছে। এমনকি পাঠ্যপুস্তক ইস্যুতেও মাঠে সক্রিয় হতে সীমাবদ্ধতা আছে। তিনি বলেন, সরকার হেফাজতকে সাইনবোর্ড সর্বস্ব বানানোর ফন্দি করছে। মুক্তি দেওয়ার আগে পরিবার থেকে মুচলেকা নেওয়া হচ্ছে- কারামুক্ত হয়ে তারা সরকারবিরোধী কথাবার্তা বলতে পারবে না। রাজনৈতিক কোনো সংগঠনেও জড়িত হতে বারণ।

এক প্রশ্নের জবাবে এই নেতা বলেন, একটি গণতান্ত্রিক দেশে এত বড় সংগঠনের রাজনীতির বাইরে যাওয়া কঠিন। শাপলা চত্বর থেকে শুরু করে অনেক কিছুতেই রাজনীতি হয়েছে। হেফাজত হয়তো কৌশলগত কারণে এখন অবস্থান পাল্টাচ্ছে।

চট্টগ্রামের একজন হেফাজত নেতা বলেন, আমরা বর্তমান নেতৃত্বে ক্ষুব্ধ। তারা বন্দি নেতাদের মুক্তির দাবিতে মাঠে কিছুই করতে পারল না। সাংগঠনিক অবস্থা চরম দুর্বল। জনপ্রিয় নেতাদের নাম নিতেও তাদের লজ্জা লাগে।

সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব মনে করেন, সরকারের অনুকম্পা ছাড়া কেউ কিছু করতে পারেনি। খোদ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও নির্বাহী আদেশে কারামুক্ত হয়েছেন। তবে হেফাজত প্রয়োজনবোধে জোরালো পদক্ষেপ নেবে।

গত বছরের জুনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেওয়া এক চিঠিতে সরকার ‘বিব্রত’ হয়, এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কারাবন্দি নেতাদের মুক্তি চেয়েছিল হেফাজতে ইসলাম। 

চিঠিতে বলা হয়, আমরা কথা দিচ্ছি, কারাবন্দি নেতাকর্মীরা মুক্তি পেলে পরে তারা এমন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত হবেন না, যাতে রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান ও সহিংসতার ঘটনায় হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে ১৫১টির মতো মামলা হয়। এরপর ২০২১ সালের মার্চ মাসে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে বায়তুল মোকাররম, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে সহিংস ঘটনা ঘটে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ১৯ জনের মৃত্যু হয়। এসব ঘটনায় সারা দেশে ১৩৪টি মামলা হয়। এসব মামলা এখনও তদন্তাধীন।

Share this post

Join the conversation