10:06:43 pm
Tuesday, August 25

একুশ ও অমর একুশে গ্রন্থমেলা

একুশের বইমেলা এখন আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। পাঠক-লেখক-প্রকাশক সবাই একুশের বইমেলার অপেক্ষায় থাকে। হ্যাঁ, বই সারা বছরই প্রকাশ হচ্ছে। তবুও কেন জানি আমাদের প্রধান আকর্ষণ একুশের বইমেলার দিকে। এমনকি আমাদের বইগুলোর বেশিরভাগেরই প্রিন্টার্স পেজে উল্লেখ থাকে-‘প্রকাশ : একুশের বইমেলা’, তার পাশে প্রকাশ সাল। এর পেছনে রয়েছে আমাদের জাতীয় চেতনার বহিঃপ্রকাশ। কারণ একুশে ফেব্রুয়ারি আর বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের চেতনা, শক্তি ও সাহস পরস্পর হাত ধরাধরি করেই এগিয়েছে। মাতৃভাষা তো শুধু মানুষের মুখের ভাষা প্রকাশই নয়, সমগ্র জাতির অধিকার ও অভিব্যক্তি প্রকাশের রূপ। ভাষার দাবি পৃথিবীর সব মানুষের জন্মগত অধিকার। একে অগ্রাহ্য করার ধৃষ্টতা কারও পক্ষেই দেখানো সম্ভব নয়। কারণ পণ্যদ্রব্যের মতো মানুষের স্বকীয়তা বিক্রি হয়ে যাওয়ার অশুভ কাল বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে।
‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ আমাদের জাতীয় চেতনা ও সত্তা অর্জনের দিন। সভ্যতার ইতিহাসে আজ বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের রক্তঝরা দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। একুশের আন্দোলনের প্রধান প্রেরণা ছিল একটি বিশেষ ভূখ-ের মানুষের আত্মমর্যাদা ও অধিকার অর্জন। পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে আরও অনেক দেশ স্বাধীনতা পেয়েছে। কোথাও কোথাও এমন হয়েছে, তারা স্ব-শাসনের অধিকার পেলেও প্রকৃত মুক্তি অনেকেরই আসেনি। আমরা ছিলাম সেই দলভুক্ত। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশের কবল থেকে স্বাধীনতা পেয়েও দেশীয় শোষকের কবলে যেন নতুন করে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম আমরা। অন্য ধরনের শোষণ। পূর্ব বাংলার সচেতন মানুষের তা বুঝতে বেশি সময় লাগেনি। একসময় পাকিস্তান নামক দেশটির পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অংশের মাঝে দেখা যায় আদর্শ ওসংস্কৃতির বিভক্তিচিহ্ন। শুধু ভৌগোলিক বিভক্তিই নয়, এর শক্তিশালী অংশের শাসককুল শোষণের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল দুর্বল অংশের দিকে অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের দিকে, বাঙালিদের দিকে। প্রকৃত অর্থে দুই অংশের মাঝে বড় ফারাক ছিল স্ব স্ব অঞ্চলের সংস্কৃতি ও আচার। এমনকি প্রাকৃতিক পরিবেশেও কিছু ভিন্নতা ছিল। এ থেকেই সূচিত হয় রুচিভেদের, চিন্তার ভিন্নতার। এ সবকিছু নিয়েই আমরা এক রাষ্ট্রের নাগরিক ছিলাম প্রায় দুই যুগ। 
নতুন রাষ্ট্রক্ষমতা পাকিস্তানি শাসকদের এমনই অন্ধ করে রাখে যে, একই দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে তারা প্রায় অবজ্ঞাই করতে থাকে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যা হয়-মাতৃভাষার প্রশ্নে একত্রিত হয় বাঙালিরা। এমন জাতীয় সংহতি ও জনগণের সম্মিলিত কণ্ঠের প্রতিবাদ অকল্পনীয় ছিল পশ্চিমা শাসকদের কাছে। সেদিন একই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘জাতীয় সংহতি’ গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল? অবিশ্বাস্য রকম সত্য যে, এই অঞ্চলের সব মানুষের কণ্ঠ যেন সেদিন এককণ্ঠে উচ্চারিত হয়ে উঠেছিল। আত্মপরিচয়ে বাঙালিরা অনড় থাকল এবং মুখের ভাষার মর্যাদা আদায়ে সবাই ছিল দৃঢ় সংকল্প। 
নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রের তৎকালীন নেতৃবৃন্দ রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে উর্দু ও ইংরেজিকে মর্যাদা দিলেন, পুরোপুরি অবজ্ঞা করলেন বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলাকে। সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের অন্যতম ভাষা হিসেবে বাংলাকে অন্তর্র্ভুক্ত করার দাবি ওঠে। তার ভিত শক্ত হতে আর বেশি দেরি হয়নি। রাষ্ট্রভাষার দাবির পক্ষে ১৯৪৮ সালের গঠিত হলো-সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ১৯৪৮ সালে সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম ঢাকায় এসে ঘোষণা দিলেন-উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। সঙ্গে সঙ্গেই নির্ভীক যুবকণ্ঠ প্রতিবাদ করে উঠেছিল। এ যেন ছিল সম্মিলিত বাঙালির কণ্ঠনিঃসৃত উচ্চারণ। এর মধ্য দিয়ে দৃঢ় হয় জাতীয় সংহতি। ভাষার দাবিতে শুরু হয় বাঙালির মরণপণ সংগ্রাম। সেদিন প্রত্যেক বাঙালির কাছে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ ছিল বীজমন্ত্রস্বরূপ। সে বছর অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে ভাষা-সংক্রান্ত একটি একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলার জনগণ এ ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাংলা একাডেমি’। লক্ষ্য ছিল দেশজ সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য-শিল্পের উন্নতিসাধন।
বাংলা ভাষার দাবি পুঞ্জীভূত হতে হতে একসময় দাবি উঠল স্বায়ত্তশাসনের এবং তা রূপ নিল স্বাধীনতার দাবিতে। এরপর বাঙালি জাতির মহান ত্যাগের ফল হলো-বাঙালির পূর্ণ স্বাধীনতা। স্বাধীনতার জন্য বাঙালির সেদিনের সেই সংহতি ছিল জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ সর্বপ্রকার সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। বাঙালি জাতির সেই ঐক্য স্থাপিত হয়েছিল সম্মিলিত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে। যে-ঐক্য সেদিন বাঙালিকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে প্রতিবাদমুখর করে তুলেছিল, যে-ঐক্য বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। আমাদের বড় পরিচয় আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা বাংলা, আমাদের সংস্কৃতি ও সাহিত্যচিন্তা এক। মানুষ হিসেবে অহংকার করার মতো আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য রয়েছে। আমাদের গর্বিত পরিচয়-মাতৃভাষার জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি। আমরা একুশের উত্তরাধিকার। এই একুশ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক মহান দিন, যা মর্যাদার সঙ্গে সারা পৃথিবীতে পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। এ-ও এক বিরল সম্মান আমাদের জন্য।কথিত আছে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমি চত্বরে মুক্তধারা প্রকাশনীর চিত্তরঞ্জন সাহা চট বিছিয়ে বই বিক্রি শুরু করেছিলেন। এভাবে তিনি কয়েক বছর চালিয়ে যান এবং অন্যরাও এতে অনুপ্রাণিত হয়ে এগিয়ে আসেন। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ বইমেলার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে। পরে এই মেলার সঙ্গে সংযুক্ত হয় ‘বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি’। বইমেলা পাঠকের বেশ আগ্রহ জাগাতে সক্ষম হয়। ১৯৮৩ সালে এসে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ বইমেলার নাম দিল ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে সে বছর বইমেলা হয়নি, কিন্তু পরের বছর থেকে অনুষ্ঠিত হয় সাড়ম্বরে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। এই গ্রন্থমেলা বা বইমেলাটি এখন আমাদের চেতনার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের আগ্রহ, পাঠক/ক্রেতার ভিড় বেড়ে গেলে বাংলা একাডেমি চত্বরে আর স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। অবশেষে একাডেমি কর্তৃপক্ষ মেলার পরিধি ২০১৪ সাল থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত সম্প্রসারণ করে। এখন মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশক অর্ধ হাজারের মতো। 
বইমেলা শুরু হয়েছে। মেলা চলে ফেব্রুয়ারিজুড়ে। আমরাও কেউ কেউ আজ অনেকটা সিজন্যাল লেখক হয়ে গেছি। এ কথা সর্বাংশে না হলেও কিয়দংশে সত্যি। সারা বছর আমরা লিখি বটে, কিন্তু অপেক্ষা করে থাকি একুশের বইমেলার সময়ে প্রকাশের জন্য। এও যেন আজ বাঙালি সংস্কৃতির অংশ, বাঙালি জীবনধারার অংশ হয়ে গেছে। শুধুই কি লেখক- বাঙালি পাঠকও হয়ে পড়েছে একুশ-নির্ভর! একুশের বইমেলা লেখক-পাঠকের এক মহান মিলনমেলা। এই সামাজিক সত্য জীবনসত্যে রূপ পেয়েছে আজ। পৃথিবীর অন্যতম বড় বইমেলা-একুশের বইমেলা। এটা একটা জাতির অগ্রগতির পরিচায়কও। আমরা বিভিন্ন সময়ে সেøাগান তুলেছি-‘সবার জন্য বই’, ‘বই হোক নিত্যসঙ্গী’, ‘পড়িলে বই আলোকিত হই’, ‘প্রিয়জনকে বই উপহার দিন’ ইত্যাদি। বই জ্ঞানের আকর-আমরা সব সময় বলি। এমনও বলি-পড়ার কোনো বিকল্প নেই। এসব প্রবাদ বাক্য স্বীকৃত আজ আমাদের জন্য। আমাদের সন্তানদেরকে, ছাত্রছাত্রীদেরকে আমরা সবসময় পাঠে মনোযোগী হওয়ার কথা বলছি; এমনকি ছোটদের হাতেও তুলে দিচ্ছি আনন্দপাঠের বইপত্তর। তারও অন্যতম অনুপ্রেরণা আমাদের একুশের বইমেলা। যতই দিন যাচ্ছে-আয়োজন বাড়ছে বইমেলার, আয়তনও বাড়ছে। যে-মেলা চিত্তবাবুরা চটের ছালা বিছিয়ে শুরু করেছিলেন একদিন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে, তা আজ রাষ্ট্রীয় আয়োজনের অংশ। সভ্যতার বিকাশ তো এভাবেই হয়। ভাবতে আনন্দ লাগছে-নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, মনোযোগী হচ্ছি মানসম্মত বই প্রকাশ, জ্ঞান বিস্তারের।
আনন্দের সংবাদ এই যে, এতদিন আমরা দেখে দেখে যা শিখেছেন, বই প্রকাশে একদিন যারা এগিয়ে এসেছেন এই পেশায়-সময়ের প্রয়োজনে উন্নত বিশে^র মতো আমাদের দেশেও আজ ‘মুদ্রণ ও প্রকাশনা’ বিষয়ে উন্মুক্ত হয়েছে উচ্চশিক্ষার দ্বার। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে পালন করেছে পথিকৃতের ভূমিকা, চালু করেছে ‘মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ’। এ ক্ষেত্রে-ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় আমাদের ভাষা আন্দোলন, আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই পালন করে এসেছে অগ্রণী ভূমিকা। ‘মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ’ চালুর ফলে দৃঢ়ভাবে আশা করা যায়, আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশনা এবং একই সঙ্গে আমাদের প্রকাশনা শিল্প অদূর ভবিষ্যতে এগিয়ে যাবে বিশে^র সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। যতই দিন যাবে আমাদের একুশের মেলা বিশ্বে সেরা বইমেলার মর্যাদা পাবে-সেই দিন আর বেশি দূরে নয়। আমরা বেশি বই রফতানি করে জাতীয় সমৃদ্ধিতেও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হব। এও আশা করি আমরা, ততদিনে আমাদের দেশও স্থান পেয়ে যাবে উন্নত দেশের কাতারে। 

Share this post

Join the conversation