ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা তুলে দাঁড়াবে তুরস্ক
অন্ধকার এক শীতের সকাল, সবকিছু থরথরিয়ে কাঁপছে। চারদিকে ধুলো উড়ছে, জমে আছে রক্ত, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ধ্বংসস্তূপ আর মৃতদেহ। সোমবারের ভূমিকম্পে তুরস্ক আর সিরিয়ার এই পরিণতি। হ্যাঁ, রিখটার স্কেলের মাপে কিংবা নিহতদের সংখ্যায় এই ভূমিকম্প হয়তো পৃথিবীর ইতিহাসে বৃহত্তম পাঁচটি ভূমিকম্পের মধ্যে থাকবে না। তবুও, তুরস্কের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এত ভয়ংকর ভূমিকম্প আর কখনোই হয়নি। ৭.৮ মাত্রার এই ভূমিকম্প এই শতাব্দীতে তুরস্কের ওপর নেমে আসা সবচেয়ে তীব্র আঘাত।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবসময়ই নিয়ে আসে অকল্পনীয় যন্ত্রণা আর দুর্ভোগ, যার ছাপ থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম। নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই পাঁচ অঙ্কের ঘর ছাড়িয়ে গেছে, অসংখ্য মানুষ এখনও চাপা পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপের নিচে। অন্যদিকে সিরিয়াতে প্রায় ৩০০ মানুষ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, হাজারো আহত মানুষ বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে। এই ভূমিকম্প ফিরিয়ে এনেছে ১৯৯৯ সালে ইজমিতের ভূমিকম্পের তিক্ত স্মৃতি। এবারের ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সেবারের চেয়েও অনেক বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ রিখটারের নিক্তিতে এবারের ভূমিকম্পের তীব্রতা বেশি।
সেবারের ভূমিকম্পের সঙ্গে এবারের একটা বড় পার্থক্য হলো- এবারের ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে। অন্যদিকে ১৯৯৯ সালের সেই ভূমিকম্পের শিকার হয়েছিল ইস্তানবুল ও সাকারিয়ার মতো শিল্পায়িত এবং সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ প্রদেশগুলো এবং তার সঙ্গে কোজেইলি প্রদেশের গোলজুক, দারিজা ও দেরিঞ্জে জেলা। যদিও এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির অনুমান করা বেশ কঠিন; কিন্তু প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ধারণা করা হচ্ছে- এবারের ক্ষতির পরিমাণ ইজমিতকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। প্রাথমিক ভূমিকম্পের পর ৪০টিরও বেশি আফটারশক অনুভূত হয়েছে, যাদের মধ্যে একিনোজু শহরের ৪ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্বে আঘাত হানা একটি কম্পনের তীব্রতা ছিল ৭.৫। ১২ ঘণ্টার মধ্যে দ্বিতীয়বার এই বৃহদাকারের কম্পন পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে।
প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান জানিয়েছেন, ১৯৩৯ সালের পর তুরস্কেতে এত তীব্র ভূমিকম্প আর কখনো হয়নি এবং এই ভূমিকম্পে ২৮১৮ দালান ধসে পড়েছে। এরদোগান ১৯৩৯ সালের যে ভূমিকম্পের কথা বলেছেন, সেই এর্জিঞ্জান ভূমিকম্পে প্রায় ৩৩০০০ মানুষ নিহত হয়েছিল, অন্যদিকে ১৯৯৯-এর ইজমিত ভূমিকম্পে প্রাণ হারিয়েছিল ১৭০০০-এরও বেশি মানুষ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবসময়ই দেশগুলোর জন্য বড় একটি পরীক্ষা হয়ে আসে। অতীতে তুরস্ক বড় আকারের ভূমিকম্পসহ আরও অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করেছে। পরপর দুটি বিশাল আকারের ভূমিকম্পের প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার অনেক দালান ইটের গাঁথুনি কিংবা ভঙ্গুর কংক্রিটে তৈরি, যার ফলে সেসব দালান ছিল ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ভূমিকম্পের ফলে বাড়ি, স্কুল, হাসপাতালসহ অনেক দালান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উদ্ধার অভিযান চলছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তুর্কি সরকার এই দুর্যোগের প্রতিক্রিয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে সব সম্পদকে কাজে লাগিয়েছে। উদ্ধারকর্মী ও চিকিৎসাকর্মীদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। দুর্যোগ ও জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (আফাদ) উদ্বাস্তু মানুষের সাময়িক আশ্রয়ের জন্য তাঁবু গড়ে দিতে কঠোর পরিশ্রম করছে। তুরস্কের সামরিক বাহিনী এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলগুলোও ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযানে যোগ দিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পারস্পরিক সাহায্যের দৃষ্টান্তমূলক ও আবেগঘন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। ওই এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল নিয়োগ করা হয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা জীবিতদের খুঁজে বের করার জন্য অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ভূমিকম্পের ফলে বিশাল আকারের শক্তি সংকটও দেখা দিয়েছে। ফলে এই শীতল আবহাওয়ায় উদ্ধার অভিযান আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, এই ভূমিকম্পের ধারাবাহিকতায় আরও কয়েক সপ্তাহ ধরে ছোট ও মাঝারি আকারের অসংখ্য ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই উদ্ধার অভিযান আরও বেশি দুঃসাধ্য হয়ে উঠতে পারে। তাৎক্ষণিক তিনটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা প্রয়োজন : এই প্রতিকূল আবহাওয়ায় কয়েক টন কংক্রিটের নিচে এখনও চাপা পড়ে থাকা মানুষদের উদ্ধার করা, জীবিত ও আহতদের জন্য সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রণয়ন।
এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ যথাযথভাবে মোকাবিলা করার জন্য তুরস্কের প্রস্তুতি তুলনামূলকভাবে ভালো। সাম্প্রতিককালে ইজমিরের ভূমিকম্প-পরবর্তী পুনর্বাসন প্রকল্পে তা দেখা গেছে কিন্তু সীমানার ওপারে সিরিয়ার অবস্থা সত্যি বলতে অবর্ণনীয়।
১১ বছর ধরে অবিরাম যুদ্ধের আঘাত সয়ে আসা সিরিয়ানরা এই দুর্যোগ মোকাবিলা করার মতো অবস্থানে একেবারেই নেই। উত্তর-পশ্চিম সিরিয়াতে পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এই মুহূর্তে সিরিয়া একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রতিকূল আবহাওয়া, বিধ্বস্ত দালান এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে হাসপাতালগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত। সেখানে জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতিও ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এই ভূমিকম্প সারা বিশ্ব থেকে ব্যাপক সমর্থনের সূচনা করেছে, বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা সাহায্য ও সম্পদ প্রেরণের মাধ্যমে ত্রাণ কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদিও উদারতার সঙ্গে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে; কিন্তু কোনো ধরনের আর্থিক বা বস্তুগত সহায়তাই পরিবার ভাঙার এবং প্রিয়জন হারানোর বেদনাকে প্রশমিত করতে পারবে না। প্রেসিডেন্ট এরদোগান তার সুপরিচিত নেতৃত্বশৈলীতে বিরাট এই দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অন্যান্য দেশে মানবিক সহায়তা প্রেরণের ক্ষেত্রে তুরস্কের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে।
২০০৫ সালে বিশাল এক ভূমিকম্প কাশ্মিরসহ পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে আঘাত হানে। এতে ৮৯০০০ মানুষ নিহত হয় এবং ঘর হারায় ২০ লাখেরও বেশি। সে সময় ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে তুর্কির সক্রিয়তাই ছিল সবচেয়ে বেশি। এখনও তুরস্কের এই উদারতার চিহ্ন হিসেবে রয়ে গেছে অনেক তুরস্ক-অর্থায়িত স্কুল এবং পুনর্বাসন কলোনি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তুরস্কের জন্য নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ নয়, দেশটি এই বিপর্যয় থেকে আবারও মাথা তুলে দাঁড়াবে। কিন্তু এবার সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ। একটি নয়, পরপর দুটি বৃহৎ ভূমিকম্প। স্বস্তির বিষয় হলো- তুর্কি জনগণ এই বিপর্যয় মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত।
লেখক : পাকিস্তানের করাচি নিবাসী একজন ডাক্তার ও প্রাবন্ধিক। ডেইলি সাবাহতে প্রকাশিত এ লেখাটি সময়ের আলোর জন্য অনুবাদ করেছেন রূপম আদিত্য।

Join the conversation