আমরা চাই সব স্টলে আমাদের বই থাকুক: বইমেলায় দৃষ্টিজয়ীরা
রাজধানীর বদরুন্নেসা কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আয়েশা আক্তার তন্বী। জন্মের পর থেকেই চোখে দেখতে না পেলেও অমর একুশে বইমেলায় ঠিকই এসেছেন। মেলায় এসে হাতের স্পর্শে ব্রেইল নামক বিশেষ একটি পদ্ধতিতে ছাপানো বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাঁদের পাহাড় বই পড়ছেন তিনি।
মঙ্গলবার বইমেলার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনীর স্টলে গিয়ে এমন দৃশ্যের দেখা মেলে। শুধু তন্বী নয়, তার মতো এমন অনেক বইপ্রেমী যারা দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতার শিকার তারা বই পড়তে আসেন বইমেলায়। তাদের বই পড়ার এ সুযোগ করে দিয়েছে স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনী। শুধু স্টলে বসে পড়া নয়, চাইলে দৃষ্টিজয়ীরা রেজিস্ট্রেশন করে বিনামূল্যে বই নিয়েও যেতে পারেন।
গত ১৫ বছর ধরে দৃষ্টিহীনদের বইয়ের আলোয় আলোকিত করার কাজ করে যাচ্ছে স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনী। বইমেলার বাংলা একাডেমি অংশের বহির্গমন ফটকের পাশেই অবস্থিত তাদের স্টল যার নম্বর ৮৮৭ ও ৮৮৮। এই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি মূলত স্পর্শ ফাউন্ডেশনের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান।
বর্তমানে এই প্রকাশনী থেকে ব্রেইল পদ্ধতিতে মোট ১৩১টি বই প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে। গত বইমেলায় ১০১তম বইটি ছেপেছিল তারা। এ বছর বইমেলায় নতুন করে আরএ ৩১টি বই যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে যার অধিকাংশের মুদ্রণ কাজ প্রায় শেষের দিকে। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে বিশেষ করে সাহিত্যের বইগুলো ব্রেইল পদ্ধতিতে প্রকাশ করে যাচ্ছে স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনী। জাফর ইকবাল, সেলিনা হোসেন, লুৎফর রহমান লিটনসহ প্রতিথযশা লেখকদের বই ব্রেইল পদ্ধতিতে করে বিনামূল্যে বিতরণ করে প্রতিষ্ঠানটি।
স্টলে থাকা আয়েশা আক্তার তন্বী বলেন, আমরা যারা চোখে দেখতে পাই না, তাদেরও জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করাই স্পর্শ ব্রেইলের উদ্দেশ্য। আমি এ ফাউন্ডেশনের সদস্য। বইমেলায় এসে আমরাও বই পড়তে পারছি, এ আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমরা চাই আরও অনেক লেখকের বই পড়তে। আমরা চাই সব স্টলে আমাদের বই থাকুক।
ব্রেইল হলো স্পর্শভিত্তিক এক ধরনের পঠনপদ্ধতি। এর মাধ্যমে দৃষ্টিহীন ব্যক্তিরা বই পাঠ করতে পারেন। বর্ণকে সাঙ্কেতিক চিহ্নে পরিণত করে এই পদ্ধতিটি কাজ করে। ব্রেইলের গঠন হলো আয়তাকার প্লেটের মতো। এর ওপরে রয়েছে দুটি সারিবিশিষ্ট একটি বিশেষ উপকরণ।
প্রতিটি সারিতে রয়েছে একটি নির্দিষ্টসংখ্যক ব্রেইল কোশ। প্রতিটি কোশে ছয়টি বিন্দু থাকে। বিন্দু বা ডটগুলো বিন্যাসের একটি নিজস্ব পদ্ধতি আছে। ডটগুলো বিভিন্নভাবে সাজিয়ে বিভিন্ন বর্ণ তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া থাকে স্টাইলাস, যেটি দিয়ে চাপ দিলে নিচে রাখা শক্ত কাগজ চাপের ফলে গর্ত হয়ে যায়। এভাবে সাঙ্কেতিক পদ্ধতিতে কাজ করে এই পদ্ধতি।
স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনের উদ্যোক্তা নাজিয়া জাবীন। এ উদ্যোগের শুরুর দিকের বিষয়ে সময়ের আলোকে তিনি বলেন, ২০০২ সালে আমার একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আমার দৃষ্টিজয়ী অনেক বন্ধুরা এসেছিলেন। তারা আমার বইটি পড়তে পারেননি। এ বিষয়টি আমাকে ভাবায়। তখন আমি ব্রেইল প্রেস খুঁজতে থাকি। ২০০৯ সালে আমার লেখা শিশুতোষ ছড়ার বই ‘ছড়া তালে মনটা দোলে’ এর ব্রেইল করি। একটি বই দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। গতবারের বইমেলায় আমরা শততম বইটি ব্রেইল পদ্ধতিতে প্রকাশ করেছি। এ বছর আরও ৩১টি নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে। এটি অনেক আনন্দের। যারা বই পড়তে চায়, কিন্তু পারে না, তাদের জন্য কিছু করাটা অবশ্যই আনন্দের।
প্রকাশকদের নিকট অন্তত একটি করে বই ব্রেইল পদ্ধতিতে রূপান্তর করে স্টলে রাখার অনুরোধ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, যারা প্রকাশক আছেন, তারা যদি প্রতিবার একটি করে হলেও বই ব্রেইল পদ্ধতিতে রূপান্তর করেন, আমাদের দেন, তাহলেও কিন্তু অনেক বড় একটি কাজ হয়। কারণ দৃষ্টিজয়ীরা কেন একটি স্টলে সীমাবদ্ধ থাকবে। পাশাপাশি বইয়ের ব্রেইল করতে লেখকের অনুমতি প্রয়োজন। এ বিষয়ে তাদের সদিচ্ছা প্রয়োজন। আমরা তো এটি নিয়ে কোনো ব্যবসা করছি না। আমরা চাই বই পড়ার স্বাদ যেন সব পাঠক নিতে পারেন।
নাজিয়া জাবীন বলেন, বইমেলা তখনই প্রাণের মেলা হয়ে উঠবে যখন সব পাঠক বই পড়ার সুযোগ পাবেন। যারা দেখতে পান না, তাদের পড়া জন্য পদ্ধতি আছে। তাহলে তারা কেন বই পড়ার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবেন। আমরা অনেক ছোট আকারে শুরু করেছি। সবার সহায়তায় আমরা এখন আরও বড় পরিসরে কাজ করছি। আমরা গণগ্রন্থাগার, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের গ্রন্থাগারে ব্রেইল বই দিয়ে সব দৃষ্টিজয়ীদের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে কাজ করছি।

Join the conversation